গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এক দৃশ্য হলো বর্ষার রাতে উঠানে বা ঘাসের ওপর কই মাছের লাফালাফি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, ‘আজ কই ওঠার বৃষ্টি নেমেছে’। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল লোককথা মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে চমকপ্রদ বিজ্ঞান এবং কই মাছের অনন্য শারীরিক গঠন। তবে সব ধরনের বৃষ্টিতে কই মাছ ডাঙায় উঠে আসে না; এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক পরিস্থিতি।
সাধারণ মাছ ডাঙায় উঠলে অক্সিজেন সংকটে মারা গেলেও কই মাছ দীর্ঘক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে। এর কারণ তাদের শরীরে থাকা ‘ল্যাবিরিন্থ অর্গান’ নামক বিশেষ এক অঙ্গ, যা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন নিতে সাহায্য করে। এই শারীরিক সক্ষমতার কারণেই কই মাছ অন্য মাছের চেয়ে বেশি ‘দুঃসাহসী’ হয়ে ওঠে এবং জলাশয় ছেড়ে ডাঙায় চলাফেরা করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কই মাছের এই ডাঙায় ওঠার প্রবণতা মূলত বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তারের কৌশলের অংশ। নির্দিষ্ট কিছু বৃষ্টি ও পরিবেশ এই মাছকে উসকে দেয়:
টানা ভারী বর্ষণ: যখন কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টি হয়, তখন পুকুর, ডোবা ও খাল উপচে একাকার হয়ে যায়। জলাশয়গুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি হলে কই মাছ নতুন বাসস্থানের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। একে বিজ্ঞানীরা নতুন খাবারের উৎস খোঁজা বা প্রজননের তাগিদ হিসেবে দেখেন।
প্লাবনের বৃষ্টি: যে বৃষ্টিতে চারপাশ প্লাবিত হয় এবং অগভীর পানির স্তর তৈরি হয়, সেই পরিবেশ কই মাছের জন্য সবচেয়ে অনুকূল। কাদা ও ভেজা ঘাসের ওপর পাখনার সাহায্যে শরীর ঠেলে কই মাছ অনেকটা ‘হামাগুড়ি’ দিয়ে এগোয়। শরীর শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকায় প্লাবনের সময়ই এদের বেশি দেখা যায়।
অনেকে লক্ষ্য করেছেন যে, ঝুম বৃষ্টির পর আবহাওয়া যখন শান্ত হয় এবং রাত বাড়ে, তখনও কই মাছ ডাঙায় ওঠে। এর কারণ হলো ভেজা মাটি ও বাতাসের আর্দ্রতা। বৃষ্টির পর মাটি ঠান্ডা থাকে এবং কাদা নরম থাকে, যা কই মাছের চলাচলের জন্য নিরাপদ। রোদের তাপ না থাকায় শরীর শুকিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না বলেই শান্ত ভেজা রাতকে তারা বেছে নেয়।
সব সময় কেবল আনন্দের জন্য কই মাছ ডাঙায় ওঠে না। অনেক সময় জলাশয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে বা জৈব পদার্থের পচনের কারণে পানি দূষিত হলে কই মাছ বিকল্প আশ্রয়ের সন্ধানে ডাঙায় উঠে আসে। বৃষ্টি তখন তাদের জন্য পালানোর একটি বড় সুযোগ বা সংকেত হিসেবে কাজ করে।
হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টি বা দুপুরের ১০ মিনিটের একপশলা বৃষ্টিতে সাধারণত কই মাছ ওঠে না। কারণ এই সামান্য বৃষ্টিতে জলাশয়গুলোর মধ্যে কোনো সংযোগ তৈরি হয় না এবং মাটিও পর্যাপ্ত ভেজে না। পরিস্থিতি বা পরিবেশের বড় কোনো পরিবর্তন না হলে কই মাছ তার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে নড়াচড়া করে না।
প্রকৃতিবিদদের মতে, অনেক প্রাণী বায়ুচাপ বা আর্দ্রতার পরিবর্তন আগেই টের পায়। কই মাছও সম্ভবত পরিবেশের এমন সূক্ষ্ম সংকেত বুঝতে পারে, যার ফলে বৃষ্টির আগেই গ্রামীণ মানুষ এই মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। শতাব্দী প্রাচীন এই লোককথার আড়ালে লুকিয়ে আছে কই মাছের বিবর্তন ও টিকে থাকার এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক সংগ্রাম।