দিনভর ঝুম বৃষ্টি, সেই সঙ্গে রাস্তায় হাঁটুপর্যন্ত পানি। অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরার পথে ছাতা বা রেইনকোট থাকার পরেও কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরা এখন অনেকেরই প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য। গরমের পর বৃষ্টির ছোঁয়া সাময়িক আরাম দিলেও, বাড়ি ফেরার পর দেখা দেয় ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি, কাশি কিংবা ত্বকের সংক্রমণের ঝুঁকি।
অনেকেই মনে করেন, বৃষ্টির পানি গায়ে লাগলেই বুঝি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
বৃষ্টিতে ভিজলে কি আসলেই অসুখ হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের চিকিৎসা কেন্দ্র ‘কনসিয়ার্জ পেডিয়াট্রিকস’- এর প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. জোনাথন বি জ্যাসি জানান, সরাসরি বৃষ্টির পানি মানবদেহে কোনো রোগ সৃষ্টি করে না। আসল সমস্যা লুকিয়ে আছে শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়া বা ঠান্ডা অনুভূত হওয়ার মধ্যে।
যখন শরীর দীর্ঘক্ষণ ভেজা পোশাকে থাকে, তখন শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা দ্রুত নামতে শুরু করে। তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাতাসে ও চারপাশে থাকা সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাসগুলো সহজে শরীরে বাসা বাঁধে।
বাইরে থেকে কাকভেজা হয়ে ফেরার পর সুস্থ থাকতে ৫টি জরুরি পদক্ষেপ
থাইল্যান্ডের ব্যাংকক হসপিটাল গ্রুপ ভুক্ত ‘ব্যাংকক হাসপাতাল পাতায়া’- এর সুস্থতাবিষয়ক নির্দেশিকা এবং বেইজিং মিউনিসিপ্যাল হেলথ কমিশনের বেইজিং স্বাস্থ্য সেবার পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়ি ফিরে সুস্থ থাকতে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো মানা উচিত -
দ্রুত ভেজা পোশাক ও জুতা পরিবর্তন
বাড়ি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে শরীর থেকে সমস্ত ভেজা জামাকাপড় এবং ভেজা মোজা খুলে ফেলতে হবে। ভেজা কাপড় দীর্ঘক্ষণ ত্বকের সংস্পর্শে থাকলে নিউমোনিয়া ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
কুসুম গরম পানিতে গোসল
বৃষ্টিতে ভেজার পর দ্রুত কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করা এবং মাথা ধুয়ে ফেলা উচিত। বৃষ্টির পানিতে বায়ুমণ্ডলের ধুলোবালি ও ব্যাকটেরিয়া মিশে থাকে। কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে শরীর পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে এবং গোসলের সময় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান ব্যবহার করা ভালো।
পা ভালোভাবে পরিষ্কার করা
বৃষ্টির দিনে রাস্তার জমে থাকা নোংরা কাদা-পানি মাড়িয়ে ফিরতে হয়। জমে থাকা নোংরা পানি থেকে পায়ে ‘অ্যাথলেটস ফুট’ বা মারাত্মক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ হতে পারে। তাই গোসলের সময় সাবান দিয়ে পা ও আঙুলের ফাঁকগুলো ভালো করে ধুয়ে শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুছে নিতে হবে। প্রয়োজনে অ্যান্টিফাঙ্গাল পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে।
এসি ঘর এড়িয়ে চলা
বেইজিং স্বাস্থ্য সেবা চিকিৎসকদের বিশেষ সতর্কবার্তা - বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরার পর শরীর ও চুল পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত ‘লো-টেম্পারেচার’ বা এসির শীতল ঘরে ঢোকা যাবে না। এটি শরীরের তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দিয়ে ঠাণ্ডা বা অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
উষ্ণ পানি পান করা
গোসল শেষ করে শরীর ও চুল ভালো করে মুছে এক কাপ গরম আদা চা, পুদিনা চা বা গরম স্যুপ খাওয়া উপকারী। এটি শরীরের ভেতর থেকে উষ্ণতা জোগায়, রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখে এবং শ্বাসনালিকে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যা করণীয়
ভারতের ‘ফর্টিস হেল্থকেয়ার’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, সেখানকার পুষ্টিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে সুস্থ থাকার প্রধান চাবিকাঠি শরীরের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রাখা। তাদের মতে,
১) এই সময়ে দৈনিক খাদ্যতালিকায় ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন: লেবু, আমলকী, পেয়ারা এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ খাবার বেশি রাখতে হবে।
২) রাস্তার খোলা খাবার বা স্ট্রিট ফুড সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ বর্ষায় পানিবাহিত রোগ যেমন: টাইফয়েড বা ডায়রিয়ার মতো রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
৩) তৃষ্ণা কম পেলেও শরীর আর্দ্র রাখতে পর্যাপ্ত ফোটানো পানি পান করতে হবে।



