Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বৃষ্টির শব্দে কেন দ্রুত ঘুম আসে?

এর পেছনে রয়েছে 'পিংক নয়েজ' এবং আমাদের মস্তিষ্কের সাথে শব্দের এক গভীর সমীকরণ 

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

বাইরে ঝুম বৃষ্টি। জানালার গ্রাস ছুঁয়ে আসা হিমেল হাওয়া আর টিনের চালে বা কংক্রিটের ছাদে বৃষ্টির একটানা ছন্দময় শব্দ। এমন পরিবেশে বই পড়া বা অফিসের কাজ করা পাহাড়সম কঠিন মনে হয়, কিন্তু বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই দুচোখ জুড়ে নামে রাজ্যের ঘুম। বৃষ্টির দিনে এই যে এক অদ্ভুত অলসতা আর প্রশান্তি, এর পেছনে কি শুধুই আবহাওয়া দায়ী? বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্ক এবং শব্দের এক গভীর সমীকরণ।

'পিংক নয়েজ' 

আমরা সাধারণত 'হোয়াইট নয়েজ'- এর কথা শুনি, যা সব ফ্রিকোয়েন্সির মিশ্রণ। কিন্তু বৃষ্টির শব্দকে বিজ্ঞানীরা বলছেন 'পিংক নয়েজ' (Pink Noise)। এটি এমন এক ধরনের শব্দ যার ফ্রিকোয়েন্সি একটানা এবং ছন্দময়।

গবেষণায় দেখা গেছে, পিংক নয়েজ মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গকে (Brain Waves) ধীর করে দেয়। যখন বৃষ্টির শব্দ আমাদের কানে আসে, তখন মস্তিষ্ক বাইরের অন্যান্য কর্কশ শব্দ (যেমন গাড়ির হর্ন বা মানুষের চিৎকার) উপেক্ষা করতে শুরু করে। এই ছন্দময় আওয়াজ মস্তিষ্কে 'আলফা ওয়েভ' তৈরি করে, যা আমাদের গভীর ঘুমের স্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

বিবর্তনবাদ ও নিরাপত্তার অনুভূতি 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টির দিনে আমাদের এই ভালো লাগার পেছনে রয়েছে বিবর্তনবাদ বা ইভোলিউশন। আদিম যুগে যখন মানুষ গুহায় বা বনে বাস করত, তখন বৃষ্টির সময় বন্য প্রাণীরা সচরাচর বের হতো না। ফলে বৃষ্টি শুরু হওয়া মানেই ছিল এক ধরনের 'নিরাপত্তার সংকেত'। সেই আদিম প্রবৃত্তি আজও আমাদের রয়ে গেছে। তাই বৃষ্টির শব্দ শুনলে অবচেতনভাবেই মস্তিষ্ক ধরে নেয় যে এখন কোনো বিপদ নেই, আর শরীর শিথিল করে একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।

সেই সোঁদা গন্ধের রসায়ন: পেট্রিকোর

বৃষ্টির ঠিক পরেই মাটি থেকে যে সোঁদা গন্ধ বের হয়, তার একটি নাম আছে - পেট্রিকোর (Petrichor)। ১৯৬৪ সালে প্রথম এই নামকরণ করা হয়। মাটির নিচে থাকা 'অ্যাকটিনোমাইসিটিস' (Actinomycetes) নামক এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া 'জিওসমিন' নামের এক রাসায়নিক তৈরি করে। বৃষ্টির ফোঁটা যখন মাটিতে পড়ে, তখন এই জিওসমিন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এই গন্ধ মানুষের মস্তিষ্কের 'অলফ্যাক্টরি বাল্ব'-কে উদ্দীপিত করে এবং স্ট্রেস হরমোন 'কর্টিসল' এর মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে মন মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায়।

নীল আলোর অভাব ও মেলাটোনিন

বৃষ্টির দিনে আকাশ মেঘলা থাকে, ফলে সূর্যালোক পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না। সূর্যের আলোতে থাকা নীল আলো আমাদের সজাগ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু মেঘলা দিনে এই আলোর অভাবে শরীরে মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই হরমোনটি সরাসরি আমাদের ঘুমের চক্র নিয়ন্ত্রণ করে। সূর্যের আলো না থাকা মানেই শরীর মনে করে এখন বিশ্রামের সময়।

প্রকৃতির এই অদ্ভুত রসায়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৃষ্টি মানেই শুধু কাদা-জল বা যানজটের ভোগান্তি নয়; এটি মস্তিষ্কের জন্য এক অনন্য 'প্রাকৃতিক থেরাপি'। পিংক নয়েজের ছন্দ আর সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়। তাই পরের বার বৃষ্টির দুপুরে যখন কাজ ফেলে আপনার দুচোখে ঘুম জড়িয়ে আসবে, তখন নিজেকে অপরাধী ভাববেন না। বরং মনে রাখবেন, আপনার মস্তিষ্ক তখন প্রকৃতির এক  জাদুতে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিচ্ছে। বৃষ্টির এই মায়াবী ছন্দকে উপভোগ করুন, কারণ মাঝে মাঝে একটু থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়াটাও জীবনের এক বড় প্রাপ্তি। 

   

About

Popular Links

x