হাম কেন হয় এবং কীভাবে ছড়ায়, প্রাথমিকভাবে যা করতে হবে

সম্প্রতি দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর এবং শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত এই শিশুদের অনেকেরই ‘হাম’ শনাক্ত হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে এবং বেশ শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এ নিয়ে অভিভাবক, শিশুচিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হামের লক্ষণ, এর জটিলতা এবং আক্রান্ত শিশুর সুরক্ষায় করণীয় প্রথম আলোকে জানিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম মূলত ‘মিজেলস’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। উচ্চমাত্রার জ্বর, অনবরত কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ রক্তবর্ণ হওয়া এবং জ্বরের ঠিক চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র‍্যাশ নিয়ে হাম আবির্ভূত হয়। মিজেলস ভাইরাসটি শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত শিশু খুব সহজেই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি ও মস্তিষ্কের প্রদাহসহ নানা রকম জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে।

এছাড়া হামের কারণে আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর মজুত মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে শিশুর চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, যা থেকে রাতকানা রোগ এবং পরবর্তীতে স্থায়ী অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে।

হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে এই ভাইরাস আশপাশে থাকা অনেক সুস্থ্ শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুতই পুরো এলাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়—প্রথমবার ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয়বার ১৫ মাস বয়সে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৮৮ শতাংশ দুই ডোজ ‘এমআর’ টিকা গ্রহণ করেছে এবং তারা প্রায় সারা জীবনের জন্য হামের সংক্রমণ থেকে মুক্ত।

দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার প্রধান কারণ হলো, এখনো দেশের অনেক দুর্গম বা অসচেতন অঞ্চলের শিশুরা এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা তাদের টিকাকেন্দ্রে নেওয়া হয়নি। কেউ কেউ আবার মাত্র এক ডোজ টিকা পেয়েছে। এই টিকাবঞ্চিত শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, তেমনি তাদের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি থাকে। এছাড়া অনেক সময় টিকা নেওয়ার পরও শিশুর শরীরে আশানুরূপ রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলে সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হতে পারে।

কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, অনতিবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত শিশুর সুরক্ষায় ও সংক্রমণ রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি: শিশুর শরীরে র‍্যাশ দেখা দেওয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচ দিন তাকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (আইসোলেশন) রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ শিশুকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে। এ সময় আক্রান্ত শিশুর স্বাভাবিক খাবার, পর্যাপ্ত পানীয় ও নিয়মিত পরিচর্যা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না। যদি হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর দৃষ্টিতে সমস্যা হয় বা চোখের মণি ঘোলা লাগে, তবে ১৪ দিনের মাথায় আরও একটি (মোট ৩টি) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।

হামে আক্রান্ত শিশুর যদি শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, খিঁচুনি, নিস্তেজ হয়ে পড়া, চোখের মণি ঘোলা হয়ে আসা কিংবা মুখের ভেতর গভীর ঘা দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। হাসপাতালে শিশুকে আলাদা ওয়ার্ড বা কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় আইসোলেশন ও নিবিড় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।