গাড়ির জানালা বন্ধ করে এসির ঠান্ডা বাতাসে বসে থাকা যেমন আরামদায়ক, তেমনি সামান্য অসাবধানতা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গাড়ির ভেতরেই তৈরি হতে পারে মৃত্যুফাঁদ। বিশেষ করে ইঞ্জিন চালু রেখে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি থামিয়ে ভেতরে বসে থাকা বা ঘুমানো ডেকে আনতে পারে আপনার আকস্মিক মৃত্যু।
সম্প্রতি ওমানে গাড়ির ভেতরে চার বাংলাদেশি ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে, যার কারণ হিসেবে ময়নাতদন্তের পর কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের বিষক্রিয়াকে নিশ্চিত করেছে দেশটির পুলিশ। এরপর বন্ধ গাড়িতে না ঘুমানোর বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কার্বন মনোক্সাইড আসলে কী
গাড়ির এসি ইউনিট নিজে থেকে কোনো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে না। আসল বিপদটি আসে গাড়ির ইঞ্জিনের এক্সজস্ট বা ধোঁয়া নির্গমন পাইপ থেকে। পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল বা সিএনজির মতো জ্বালানি যখন ইঞ্জিনে অপূর্ণভাবে পোড়ে, তখন উপজাত হিসেবে তৈরি হয় কার্বন মনোক্সাইড (CO) গ্যাস। এটি সম্পূর্ণ বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন একটি গ্যাস। এর কোনো বিশেষ অনুভূতি, চোখ জ্বালাপোড়া বা ঘ্রাণ না থাকায় একে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। গাড়িতে থাকা ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারেন না যে তিনি বিষাক্ত গ্যাস গ্রহণ করছেন।
গাড়িতেই কেন এর ঝুঁকি বেশি
সাধারণভাবে গাড়ি চলতে থাকলে এক্সজস্ট পাইপ দিয়ে এই গ্যাস বাইরে বের হয়ে বাতাসে মিশে যায়। কিন্তু গাড়ি দীর্ঘক্ষণ স্থির অবস্থায় থাকলে বিশেষ করে বদ্ধ জায়গা, কম বাতাস চলাচল করে এমন স্থান বা নিচু জায়গায় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলে, নির্গত গ্যাস গাড়ির আশপাশে জমে যেতে পারে।
এমন অবস্থায় এক্সজস্ট সিস্টেমে কোনো লিক, ত্রুটি বা গাড়ির বডিতে ফাঁক থাকলে কার্বন মনোক্সাইড গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এমনকি গাড়ির এসি ও ভেন্টিলেশন সিস্টেমের বাতাস প্রবেশের পর অর্থাৎ কেবিন এয়ার ইনটেকের মাধ্যমেও এই গ্যাস ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুস হয়ে যখন রক্তে পৌঁছায়, তখন এটি শরীরের স্বাভাবিক অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অক্সিজেন বহন করে।
হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন মনোক্সাইডের সঙ্গে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গুণ বেশি শক্তভাবে যুক্ত হতে পারে। এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের জায়গা দখল করে নেয় কার্বন মনোক্সাইড এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো (যেমন মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ড) পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
মানুষ কেন বুঝতে পারে না?
গ্যাসের কোনো গন্ধ না থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথমদিকে মাথা ঝিমঝিম করা, বমি ভাব, মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা অনুভব করেন। অনেকেই একে এসির অতিরিক্ত ঠান্ডা বা দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি মনে করে গুরুত্ব দেন না। এই অবস্থায় কেউ ঘুমিয়ে পড়লে রক্তের অক্সিজেন লেভেল কমতে কমতে ব্যক্তি ধীরে ধীরে গভীর কোমায় চলে যান এবং একপর্যায়ে তা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এসির অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
ধোঁয়া নির্গমন পাইপ ছাড়াও এসির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থেকেও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-
ছত্রাক ও অণুজীবের বিস্তার: এসির ইভাপোরেটর কয়েল ও ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার না করলে সেখানে আর্দ্রতার কারণে ছত্রাক, ধুলাবালি বা ব্যাকটিরিয়া জমে। এসি চালু করলে এগুলো বাতাসের সঙ্গে গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে, যা সংবেদনশীল মানুষের শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি বা হাঁপানির সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।
রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস লিক: কিছু পুরোনো মডেলের গাড়ির রেফ্রিজারেন্ট বা কুলিং গ্যাস লিক করলে উচ্চমাত্রায় তার সংস্পর্শে মাথা ঘোরা বা শারীরিক অস্বস্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
দুর্ঘটনা থেকে সুরক্ষা পেতে যা করতে হবে
অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন -
আবদ্ধ স্থানে ইঞ্জিন চালু না রাখা: কোনো অবস্থাতেই বদ্ধ গ্যারেজে, কম বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে বা রাস্তার পাশে দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন চালু রেখে এবং জানালা পুরোপুরি বন্ধ করে গাড়ির ভেতরে ঘুমানো যাবে না। গ্যারেজের দরজা খোলা থাকলেও দীর্ঘক্ষণ ইঞ্জিন চালু রাখা নিরাপদ নয়।
নিয়মিত যান্ত্রিক পরীক্ষা: একজন দক্ষ কারিগর দিয়ে গাড়ির এক্সজস্ট সিস্টেম বা ধোঁয়া নির্গমন পাইপ এবং কেবিনের নিচের বডি সিলগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করানো উচিত। ধোঁয়া বের হওয়ার পাইপে সামান্য ছিদ্র বা ফাটল থাকলে তা দ্রুত মেরামত করতে হবে।
ফ্রেশ এয়ার মোড ব্যবহার: দীর্ঘ যাত্রার সময় গাড়ির এসির মোড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। মাঝেমধ্যে এসির ফ্রেশ এয়ার মোড চালু করে বাইরের বাতাস ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়া উচিত, যাতে কেবিনের ভেতরের বাতাস রিফ্রেশ হয়।
একটু সচেতনতা এবং গাড়ির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণই পারে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে আপনার ও আপনার পরিবারের মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে।