কাজিনদের মধ্যে বিয়েতে স্বাস্থ্যঝুঁকি, গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

আপন চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো বা খালাতো ভাইবোনদের (ফার্স্ট কাজিন) মধ্যে বিয়ের কারণে সন্তানদের মধ্যে গুরুতর স্বাস্থ্য ও ভাষাগত ঝুঁকির হার আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক মেডিকেল গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ইউরোপের কিছু দেশে এ ধরনের বিয়ে নিষিদ্ধ করা হলেও যুক্তরাজ্যে আইনগত নিষেধাজ্ঞা বনাম সচেতনতা বৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

ব্র্যাডফোর্ড শহরে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারেরও বেশি শিশুর ওপর ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ শীর্ষক একটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা গবেষণা পরিচালিত হয়, যার বয়স এখন ১৮ বছর হতে চলেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে অন্তত একজনের বাবা-মা সম্পর্কে আপন ফার্স্ট কাজিন। এই শিশুদের একটি বড় অংশই ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি অভিবাসী সম্প্রদায়ের।

গবেষণার সাম্প্রতিক তথ্য ও গাণিতিক মডেল বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, পারিবারিক দারিদ্র্য ও বাবা-মায়ের শিক্ষার প্রভাব বাদ দেওয়ার পরও ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ঝুঁকিগুলো দেখা যায়:

ভাষাগত সমস্যা: আত্মীয় নন এমন দম্পতির সন্তানের তুলনায় ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের কথা বলা এবং ভাষাগত সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা প্রায় ১১ শতাংশ, যা সাধারণ ক্ষেত্রে মাত্র ৭ শতাংশ।

ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া: সাধারণ শিশুদের তুলনায় ফার্স্ট কাজিনদের সন্তানদের অসুস্থতার কারণে এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ বেশি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়েছে।

বিকাশের ঘাটতি: ইংল্যান্ডের সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী, সাধারণ শিশুদের তুলনায় এই শিশুদের ‘উন্নয়নের ভালো পর্যায়ে’ পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রায় ১০ শতাংশ কম (৫৪ শতাংশ, যেখানে সাধারণ শিশুদের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ)।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, বাবা-মা রক্তসম্পর্কিত হলে সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকল সেল ডিজিজের মতো মারাত্মক বংশগত রোগের বাহক হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে সন্তানদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ শতাংশে দাঁড়ায়।

ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর নীল স্মল এবং নিউনাটোলজিস্ট অধ্যাপক স্যাম ওডি জানান, ব্র্যাডফোর্ডে তারা শিশুদের গুরুতর ত্বকের সমস্যা, মস্তিষ্কের জটিলতা এবং মাংসপেশির রোগসহ একের পর এক সন্তান মারা যাওয়ার মতো দুঃখজনক ঘটনা দেখেছেন।

তবে অধ্যাপক ওডি উল্লেখ করেন, এর জন্য শুধু ফার্স্ট কাজিনের বিয়েই নয়, বরং 'এন্ডোগামি' বা একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র জাতিগত গোষ্ঠী বা বংশের মধ্যে বারবার বিয়ে হওয়ার প্রথাও দায়ী। এতে বংশগত জিন একই থাকায় রোগাক্রান্ত জিনটি প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যেও দেখা যায়।

এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নরওয়ে গত বছর ফার্স্ট কাজিনদের মধ্যে বিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেছে। সুইডেনেও আগামী বছর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে কনজারভেটিভ পার্টির এমপি রিচার্ড হোল্ডেন এই প্রথা নিষিদ্ধ করতে পার্লামেন্টে একটি বিল প্রস্তাব করেছেন। গবেষক প্যাট্রিক ন্যাশও এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এতে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নতি হবে। তবে বর্তমান লেবার সরকার জানিয়েছে, এখনই এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা তাদের নেই। বর্তমানে যুক্তরাজ্য "জেনেটিক কাউন্সেলিং" নীতি অনুসরণ করছে, যেখানে বিয়ের আগে জিনগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং গর্ভাবস্থায় বারবার পরীক্ষা করাতে উৎসাহিত করা হয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯ শতকের ব্রিটেনে এই প্রথা বেশ সাধারণ ছিল। খোদ বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন তার আপন চাচাতো বোন এমা ওয়েজউডকে বিয়ে করেছিলেন। এছাড়া রানী ভিক্টোরিয়াও তাঁর আপন চাচাতো ভাই প্রিন্স অ্যালবার্টকে বিয়ে করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীতে এই হার ১ শতাংশে নেমে এলেও কিছু দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি এখনও দৃশ্যমান। দুই বছর আগের তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ মা তাদের ফার্স্ট কাজিনকে বিয়ে করেছেন।

তবে ব্র্যাডফোর্ডের স্থানীয় অভিবাসী পরিবারগুলোর তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এখন বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষার প্রসার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে তরুণীরা এখন নিজ পরিবারের বাইরে জীবনসঙ্গী বেছে নিচ্ছেন। এমনকি যারা নিজেরা কাজিনকে বিয়ে করেছেন, তারাও স্বীকার করছেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তারা এই সংস্কৃতির বাইরে নিজেদের পছন্দে বিয়ে করার স্বাধীনতা দিতে চান।