গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে পছন্দের আইসক্রিম বা এক চুমুক ঠান্ডা কোল্ড ড্রিংকস মুখে দিতেই হঠাৎ যেন কপালে তীব্র একটা ব্যথা অনুভব হলো। মনে হয়, কে যেন কপালে একটা সুচ ফুটিয়ে দিলো! কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের জন্য চোখ-মুখ বন্ধ করে বসে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। আইসক্রিম গলে হাত বেয়ে পড়তে থাকে, আর আপনি ব্যথায় নীল হতে থাকেন।
সাধারণ ভাষায় একে আমরা বলি ‘ব্রেন ফ্রিজ’ বা ‘আইসক্রিম হেডেক’। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘কোল্ড-স্টিমুলাস হেডেক’। আপাতদৃষ্টিতে একে খুব সাধারণ ও ক্ষণস্থায়ী মনে হলেও, গবেষণা বলছে - ঘন ঘন ব্রেন ফ্রিজ হওয়া ভবিষ্যতে আপনার বড় কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি বা মাইগ্রেনের পূর্বাভাস হতে পারে।
ব্রেন ফ্রিজ আসলে কেন হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের মেয়ো ক্লিনিকের বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ (নিউরোলজিস্ট) ড. আমাল স্টার্লিং জানান, আমরা যখন খুব দ্রুত কোনো ঠান্ডা খাবার বা পানীয় খাই, তখন আমাদের মুখের ভেতরের ওপরের অংশ (তালু) বা গলার পেছনের অংশ হঠাৎ খুব বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়।
এই আকস্মিক ঠান্ডার কারণে ওই অংশের রক্তনালীগুলো তীব্রভাবে সংকুচিত হয়। এরপর রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করার জন্য শরীরের নিজস্ব নিয়মে রক্তনালীগুলো আবার হঠাৎ করে প্রসারিত বা ফুলে ওঠে। রক্তনালীর এই হঠাৎ সংকোচন ও প্রসারণের ফলে সেখানে থাকা ব্যথার ফাইবারগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটা যুক্ত থাকে আমাদের মুখের প্রধান স্নায়ু ‘ট্রাইজেমিনাল নার্ভ’- এর সাথে। এই স্নায়ুটি কপাল ও মুখের ব্যথার অনুভূতি মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। আর এই কারণেই ঠান্ডা খাবার মুখে দিলেও ব্যথাটা অনুভূত হয় কপালে বা মাথার গভীরে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয় বা খাবার হঠাৎ গ্রহণ করলে শুধু মাথাব্যথাই নয়, অনেকের ক্ষেত্রে হৃদকম্পন অস্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসকরা ‘কোল্ড ড্রিংক হার্ট’বা হার্ট অ্যারিদমিয়া বলেন। বিশেষ করে মধ্যবয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি।
মাইগ্রেনের সাথে রয়েছে এর গভীর সংযোগ
ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ পাডুয়া-র শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইরিন টোল্ডো বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ চার দশকের গবেষণা পর্যালোচনা করে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। তিনি জানান, যাদের ঘন ঘন এবং তীব্র ব্রেন ফ্রিজ হয়, তাদের পরবর্তীতে তীব্র মাথাব্যথা বা মাইগ্রেন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাইগ্রেনে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৯৩% মানুষের তীব্র ‘আইসক্রিম হেডেক’ বা ব্রেন ফ্রিজের ইতিহাস রয়েছে। অন্যদিকে, যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা নেই, তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ব্রেন ফ্রিজ অনুভব করেন।
ড. স্টার্লিংয়ের মতে, যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা থাকে, তাদের ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুটি এমনিতেই খুব সংবেদনশীল হয়। ফলে ঠান্ডার সংস্পর্শে এলেই তা দ্রুত ও তীব্রভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ৬ জন নারীর মধ্যে ১ জন এবং প্রতি ১০ জন পুরুষের মধ্যে ১ জন মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু এদের মধ্যে ৫০% এর বেশি মানুষ কখনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। তাই ঘন ঘন তীব্র ব্রেন ফ্রিজ হলে সেটিকে অবহেলা না করে মাইগ্রেনের লক্ষণ কি না, তা পরীক্ষা করা উচিত।
এটি কি বংশগত?
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ব্রেন ফ্রিজের সমস্যাটি অনেক সময় পারিবারিক বা বংশগত হতে পারে। বাবা-মায়ের যদি আইসক্রিম খাওয়ার পর মাথাব্যথার প্রবণতা থাকে, তবে সন্তানদেরও এটি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তবে এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোন জিন দায়ী, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
‘ব্রেন ফ্রিজ’ থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তির উপায়
আইসক্রিম খাওয়ার পর যদি হঠাৎ এই তীব্র মাথাব্যথা শুরু হয়, তবে তা কমানোর জন্য চিকিৎসকরা দুটি কার্যকরী কৌশলের কথা বলেছেন:
জিহ্বার ব্যবহার: আপনার জিহ্বার নিচের অংশটি মুখের ভেতরের ওপরের তালুতে শক্ত করে চেপে ধরুন। জিহ্বার নিচের উষ্ণতা মুখের তালুকে দ্রুত স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনবে এবং ব্যথা কমে যাবে।
গরম পানি: জিহ্বাও যদি খুব ঠান্ডা হয়ে থাকে, তবে বুড়ো আঙুল দিয়ে মুখের ভেতরের তালুতে হালকা চাপ দিয়ে রাখুন অথবা এক চুমুক হালকা গরম পানি পান করুন।
আইসক্রিম খাওয়া কি ছাড়তে হবে
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্রেন ফ্রিজের ভয়ে পছন্দের আইসক্রিম বা ঠান্ডা ডেজার্ট খাওয়া বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু খাওয়ার অভ্যাসে একটু পরিবর্তন আনলেই হবে।
আইসক্রিম বা কোল্ড ড্রিংকস খাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে কামড় দিন বা চুমুক দিন। প্রতিবার মুখে নেওয়ার মাঝে কিছুটা সময় বিরতি দিন, যাতে মুখের ভেতরের অংশটি স্বাভাবিক তাপমাত্রা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়। এতে ব্রেন ফ্রিজের হাত থেকেও বাঁচা যাবে, আবার খাবারের স্বাদও শতভাগ উপভোগ করা যাবে।