একসময়ের ডাইনোসর থেকেই এসেছে আজকের ব্রয়লার মুরগী?

বনের মুক্ত পরিবেশ থেকে আজকের খামারের ডাইনোসর-সদৃশ পাখি হওয়া পর্যন্ত ব্রয়লার মুরগির গল্পটি বেশ পুরনো। আমাদের ডাইনিং টেবিলের বহুল পরিচিত 'ফার্মের মুরগি' বা ব্রয়লারের বিবর্তনীয় শিকড় বুঝতে সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি গেছে সাড়ে ১২ কোটি বছর পুরোনো এক জীবাশ্মের দিকে, যা আধুনিক পাখির বিবর্তনীয় ইতিহাসের একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।

স্পেনের উত্তরাঞ্চলের বার্গোস প্রদেশে পাওয়া গেছে ‘ফসকেইয়া পেলেনডোনাম’ নামের এক প্রাক-ঐতিহাসিক ডাইনোসরের জীবাশ্ম। মাত্র ৭০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা এই ডাইনোসরটি আকারে ছিল ঠিক আজকের একটি বড়সড় মুরগি বা রাজহাঁসের সমান। বিজ্ঞানীদের মতে, আজকের আধুনিক মুরগি কিংবা পাখির এই 'ডাইনোসরীয়' রক্তধারা এবং তাদের বিবর্তনের পথচিত্র বোঝার জন্য এটি এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।

বিজ্ঞান সাময়িকী পেপারস ইন প্যালিওন্টোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দুই পায়ে হাঁটা মুরগির আকারের এই ছোট ডাইনোসরটির পেছনের পা ছিল লম্বা ও দ্রুত দৌড়ানোর উপযোগী। টি-রেক্সের মতো সামনের হাতগুলো ছোট হলেও এরা মাংসাশী ছিল না; বরং অদ্ভুত গঠনের দাঁত ও শক্ত চোয়ালের সাহায্যে তৃণভোজী জীবনযাপন করত।

স্পেনের সালাস দে লস ইনফান্তেস ডাইনোসর মিউজিয়ামের পরিচালক এবং এই জীবাশ্মের আবিষ্কারক ফিদেল তোরসিদা ফার্নান্দেজ জানান, ডাইনোসর থেকে আধুনিক পাখির (যার অন্তর্ভুক্ত আজকের মুরগিও) রূপান্তরের ইতিহাস বিজ্ঞানীরা যতটা সরল ভাবতেন, বিষয়টি আসলে তার চেয়ে অনেক জটিল। সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে ছোট ছোট এই প্রাণীগুলোই বিবর্তনের ধারায় পরিবর্তিত হয়ে আজকের পাখিকুলে রূপ নেওয়ার পথ সুগম করে।

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আদিম ডাইনোসর বংশোদ্ভূত বুনো 'রেড জাঙ্গলফাউল' থেকে হাজার বছরের প্রজনন ও বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে আধুনিক গৃহপালিত মুরগি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বুনো অবস্থায় থাকা এই পাখিকে মানুষ প্রথম পালতে শুরু করে। পরবর্তীতে ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়াতে কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজনন করানো হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪৬ সালের ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রজেক্টের পর কম সময়ে বেশি মাংস উৎপাদনকারী আধুনিক ‘ব্রয়লার’ জাতের বিকাশ ঘটে। আজকের আধুনিক ব্রয়লার কোনো হরমোন বা কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি নয়; বরং তা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনীয় ধারা এবং আধুনিক জিনগত নির্বাচনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য।

বিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচে পাওয়া সাড়ে ১২ কোটি বছর আগের সেই মুরগিসদৃশ ডাইনোসর কিংবা আজকের ফার্মের আধুনিক ব্রয়লার, উভয়ই প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানের চোখে কোনো কিছুই ছোট নয়। অতীত পৃথিবীর সেই ছোট ডাইনোসরগুলোর অস্তিত্বই আজকের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম বড় স্তম্ভ হয়ে রূপ নিয়েছে।