বন্ধুমহলের চেয়ে দু-একজনের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি? আপনি কি ‘ওট্রোভার্ট’?

একা থাকতে ভালোবাসেন বলেই কি ধরে নিয়েছেন আপনি ইন্ট্রোভার্ট? নাকি বন্ধুমহলে দারুণ আড্ডা দিতে পারেন বলে ভাবছেন আপনি এক্সট্রোভার্ট? 

যদি বলি - এর কোনোটার সাথেই আপনার মেজাজ পুরোপুরি মিলছে না? এমনটা হতেই পারে যে, ব্যক্তিগত আড্ডায় দুজন মানুষের সাথে আপনি দারুণ প্রাণবন্ত, কিন্তু পাঁচ-দশজনের একটা টিম বা দলের অংশ হলেই কেমন যেন অস্বস্তি বা বিচ্ছিন্নতা আপনাকে ঘিরে ধরে। দলের প্রতিটি সদস্যকে আলাদা আলাদাভাবে পছন্দ হলেও, পুরো ‘গ্রুপ’ বা ‘গ্যাং’-এর অংশ হিসেবে নিজেকে কিছুতেই মেলাতে পারছেন না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ ব্যক্তিত্বের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওট্রোভার্ট’।

ওট্রোভার্ট কী

‘ওট্রোভার্ট’ ধারণার জন্ম মার্কিন বিশিষ্ট মনোবিদ ও সাইকিয়াট্রিস্ট রামি কামিনস্কির হাত ধরে। স্প্যানিশ শব্দ ‘ওট্রো’ (অর্থ: অন্য বা ভিন্ন) এবং ল্যাটিন শব্দ ‘ভার্ট’ (অর্থ: দিকে মুখ করে থাকা) - এই দুয়ের সমন্বয়ে শব্দটি তৈরি। সহজ কথায়, ওট্রোভার্ট হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সবার থেকে ভিন্ন দিকে মুখ করে থাকেন।

অনেকে হয়তো একে ইন্ট্রোভার্ট এক্সট্রোভার্ট-এর মাঝামাঝি অবস্থা ভেবে ভুল করতে পারেন। কিন্তু কামিনস্কির মতে, ওট্রোভার্ট কোনো মাঝারি অবস্থান নয়, বরং এটি ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বাধীন একটি ধারা। 

সমাজ যেখানে ‘টিম স্পিরিট’ বা দলবদ্ধতাকে সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি মনে করে, সেখানে ওট্রোভার্টদের প্রায়শই ভুল বোঝা হয়। অফিসে কোনো গেট-টুগেদার এড়ানো বা বড় আড্ডায় চুপচাপ থাকা দেখে অনেকেই তাদের ‘অসামাজিক’ ভেবে বসেন। এমনকি ওট্রোভার্টরা নিজেরাও অনেক সময় হীনম্মন্যতায় ভোগেন - ‘কেন আমি আর দশটা মানুষের মতো সহজে কোনো দলের অংশ হতে পারি না?’

‘ওট্রোভার্ট’ ও ‘ইন্ট্রোভার্ট’: পার্থক্যটা ঠিক কোথায়?

বাইরে থেকে দুজনকে এক মনে হলেও ভেতরের মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ আলাদা -

মানসিক শক্তির উৎস: ইন্ট্রোভার্টদের মূল সমস্যা হলো সামাজিক মেলামেশা তাদের মানসিক শক্তি দ্রুত কমিয়ে নেয়। তাই নিজেকে ‘রিচার্জ’ করতে তারা একাকিত্ব পছন্দ করেন। ওট্রোভার্টরা কিন্তু মানুষের সঙ্গ উপভোগ করেন; তাদের সমস্যা ভিড় নয়, মূলত ‘গ্রুপ কালচার’ বা দলগত আনুগত্যের সাথে মানিয়ে নিতে না পারা।

একাত্ম হওয়ার ক্ষমতা: একজন ইন্ট্রোভার্ট মানুষ নিজের পরিবার বা পছন্দের ছোট কোনো পরিচিত গ্রুপের সাথে সম্পূর্ণ মিশে যেতে পারেন। কিন্তু একজন ওট্রোভার্টের কাছে এই ‘দলের অংশ হওয়া’র অনুভূতিটাই পুরোপুরি অনুপস্থিত।

কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য না থাকাটা ওট্রোভার্টদের সবচেয়ে বড় শক্তি। যেহেতু তারা ‘গ্রুপ থিঙ্কিং’ বা দলের প্রভাবে সহজে চালিত হন না, তাই তাদের চিন্তাভাবনা হয় অত্যন্ত স্বাধীন, নিরপেক্ষ। যেকোনো বিষয়কে বহিরাগতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাওয়ার এই ক্ষমতাই জন্ম দেয় নতুন ধারণার।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সেরা কিছু সৃষ্টিশীল মানুষের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য ছিল প্রখর। আলবার্ট আইনস্টাইন, ফ্রিডা কাহলো, ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা ফিলোসোফার সোরেন কির্কেগার্ডের মতো ব্যক্তিত্বদের চালিকাশক্তি ছিল এই স্বাধীন মানসিকতার।

সমাজ হয়তো আমাদের সবসময় কোনো না কোনো ‘দল’ বা ‘গ্রুপে’ খাপ খাইয়ে নিতে শেখায়। কিন্তু যারা স্বভাবতই প্রথার বাইরে চিন্তা করতে ভালোবাসেন, ভিড়ের অংশ না হয়ে নিজের মতো আলাদা থাকতে চান - তাদের অসামাজিক ভাবার সুযোগ নেই। হয়তো এই বিচ্ছিন্নতাই তাদের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর দিক, যা তাদের অনন্য করে রাখে।