Thursday, July 23, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

অনেক মগ থাকলেও বারবার কেন একই মগে চা-কফি খান?

মানুষের মস্তিষ্কের দুটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ‘এনডাউমেন্ট ইফেক্ট’ ও ‘মিয়ার এক্সপোজার ইফেক্ট’ এর পেছনে কাজ করে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

সকালের ঘুম ভাঙার পরপরই এক কাপ গরম চা কিংবা কাজের ফাঁকে এক মগ কফি - ক্লান্তি দূর করতে এর কোনো বিকল্প নেই। রান্নাঘরের আলমারি বা অফিসের প্যান্ট্রিতে সাজানো থাকে হরেক রকম, হরেক নকশার মগ। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, রকমারি মগের ভীড়েও আমরা প্রায় সবাই প্রতিদিন অজান্তেই একটি নির্দিষ্ট মগ বেছে নিই। ধুয়ে-মুছে বারবার সেই একটি মগেই চা-কফি খাওয়া অনেকের নিত্যদিনের অভ্যাস।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কাকতালীয় নয়। মানুষের মস্তিষ্কের দুটি সুপরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব - ‘এনডাউমেন্ট ইফেক্ট’ ও ‘মিয়ার এক্সপোজার ইফেক্ট’ এর পেছনে কাজ করে।

নিজের জিনিসকে বেশি মূল্যবান মনে করা

অফিসের ব্যস্ত পরিবেশ কিংবা পরিবারে যেখানে প্রায় প্রতিটি জিনিসই ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়, সেখানে একটি নির্দিষ্ট মগ একান্তই নিজের বলে ধরে রাখা যায়। “এটি শুধুই আমার মগ” - এই সামান্য ভাবনাটুকুর মধ্যেও এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক মালিকানাবোধ বা ব্যক্তিগত তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে।

১৯৯০ সালে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কাহনেম্যান এবং অর্থনীতিবিদ জ্যাক নেটশ ও রিচার্ড থ্যালার একটি গবেষণা করেন। এতে অংশগ্রহণকারীদের হাতে একটি কফির মগ তুলে দেওয়া হয়। এরপর তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, মগটি ছেড়ে দিতে কত টাকা চাইবেন? অন্যদিকে যাদের কাছে মগটি ছিল না, তাদের জিজ্ঞেস করা হয়, একই মগ কিনতে কত টাকা দিতে রাজি। দেখা গেলো - যাদের হাতে মগটি ছিল, তারা সেটি ছাড়তে অনেক বেশি টাকা দাবি করেন।

অর্থাৎ কোনো বস্তু আমাদের নিজের হয়ে গেলে মস্তিষ্ক সেটিকে আগের তুলনায় বেশি মূল্যবান বলে মনে করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে এটিই ‘এনডাউমেন্ট ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।

পরিচিত জিনিসের প্রতি বেশি টান

মানুষ মূলত অভ্যাসের দাস। প্রতিদিনের চেনা মগটি হাতে নেওয়ার অর্থ হলো একটি মানসিক নিরাপত্তা ও স্বস্তির অনুভূতি লাভ করা। আপনি প্রতিদিন একই মগে চা খেলে ধীরে ধীরে সেটিই আপনার কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও আরামদায়ক মনে হবে। সেটি অন্য মগের চেয়ে ভালো বলেই নয়, বরং বারবার ব্যবহার করার কারণেই।

মনোবিজ্ঞানী রবার্ট জায়ন্স দেখিয়েছিলেন, কোনো বস্তু, মুখ বা শব্দের সঙ্গে আমরা যত বেশি পরিচিত হই, ততই সেটির প্রতি আমাদের পছন্দ বাড়তে থাকে - যাকে বলা হয় ‘মিয়ার এক্সপোজার ইফেক্ট’ ।

স্বস্তির অনুভূতি

প্রথমে মগটি নিজের হওয়ায় তার মূল্য আপনার কাছে বেড়ে যায়। এরপর প্রতিদিনের ব্যবহারে সেটির সঙ্গে তৈরি হয় স্বস্তির অনুভূতি। সময়ের সঙ্গে মগটির ছোটখাটো দাগ, চিড় বা রং ফিকে হয়ে যাওয়াও আর ত্রুটি মনে হয় না; বরং সেটিই হয়ে ওঠে আলাদা পরিচয়। এ কারণেই বহু বছর ব্যবহার করা একটি সাধারণ মগ অনেক সময় নতুন ও দৃষ্টিনন্দন মগের চেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে ওঠে।

নিখুঁত অনুপাত ও স্বাদের হিসাব

পছন্দের মগে প্রতিদিন চা বা কফি বানাতে বানাতে চোখের আন্দাজটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় মাপকাঠি। কতটুকু দুধ, কফি কিংবা চিনি দিলে স্বাদ একদম মনের মতো হবে, তা ওই নির্দিষ্ট মগের আকারের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন কোনো মগে চা ঢাললে সেই অনুপাত বা মিষ্টির হিসাব ওলটপালট হয়ে কফির স্বাদ নষ্ট হওয়ার একটা ভয় কাজ করে।

নতুন মগে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে

প্রিয় মগটি বদলে নতুন একটি মগ ব্যবহার করতে গেলে অনেকের অস্বস্তি লাগে। নতুন মগটির সঙ্গে এখনো কোনো স্মৃতি বা পরিচিতি তৈরি হয়নি। ফলে সেটি দেখতে যত সুন্দরই হোক, পুরোনো মগের মতো আপন লাগে না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি অতিরিক্ত আবেগ নয়। বরং মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত ও নিজের বলে মনে হওয়া জিনিসের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি আকৃষ্ট হয়। তাই প্রতিদিন সকালে একই মগে চা বা কফি খাওয়ার অভ্যাসের পেছনেও কাজ করে মানুষের মনস্তত্ত্বের সুপ্রতিষ্ঠিত কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

পছন্দের মগে চা-কফি খাওয়া কেবল তৃষ্ণা মেটানো নয়; এটি মূলত দিনের ব্যস্ততার মাঝে নিজের জন্য ছোট্ট একটু স্বস্তির মুহূর্ত তৈরি করা। সারাদিনের ধকলের পর নিজের চেনা মগটি হাতে পাওয়া যেন এক টুকরো চেনা প্রশান্তি। তাই ঘরে বা অফিসে শত শত সুন্দর মগ থাকলেও, সেই এক মগের প্রতি মানুষের টান থেকে যায় আজীবন।

   

About

Popular Links

x