উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপের দেশগুলোতে যাওয়ার আগ্রহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে। তুলনামূলকভাবে উন্নত জীবনযাত্রা, নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত উচ্চশিক্ষা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার সুযোগ থাকায় অস্ট্রিয়াও বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। সম্পূর্ণ অপরিচিত দেশটিতে পাড়ি জমান লাখ লাখ শিক্ষার্থী। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো অন্যান্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর চেয়ে তুলনামুলকভাবে সাশ্রয়ী খরচে পড়াশোনার সুযোগ দেয়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিশ্বায়নের উজ্জ্বল একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে শেনজেনভুক্ত দেশ অস্ট্রিয়া।
অস্ট্রিয়া কেন উচ্চশিক্ষার গন্তব্য
জাতীয়ভাবে আর্থ-সামাজিক অবস্থা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ট্রিয়াকে একটি নিরাপদ অভিবাসনের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একইসঙ্গে বিশ্ব জুড়ে ব্যবসা ও শিক্ষাভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলোতে এর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশটিকে পরিণত করেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে।
অস্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থী ও স্কলারদের অভিজাত নেটওয়ার্কগুলোতে বহুল সমাদৃত। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি এবং টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা। আর শেনজেনভুক্ত দেশ হওয়ায় সুযোগ থাকছে একইসঙ্গে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো ভ্রমণ করার। এর মাধ্যমে একাধিক ডিগ্রি নেওয়ার এবং চাকরি কিংবা ব্যবসা ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারকে সুবিস্তৃত করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
অস্ট্রিয়ার জনপ্রিয় কিছু বিশ্ববিদ্যালয়
অস্ট্রিয়ার পরিচিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে -
- ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা
- টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা
- ইউনিভার্সিটি অব ইনসব্রুক
- ইউনিভার্সিটি অব গ্রাজ
- গ্রাজ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি
- ইউনিভার্সিটি অব ক্লাগেনফুর্ট
- ইউনিভার্সিটি অব সালজবুর্গ
- জোহানেস কেপলার ইউনিভার্সিটি লিনৎস
- ইউনিভার্সিটি অব ন্যাচারাল রিসোর্সেস অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস, ভিয়েনা
- ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস
এছাড়া অস্ট্রিয়ায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আর্টস বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
চাহিদাসম্পন্ন কিছু বিষয়
অস্ট্রিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক ও কলা, ব্যবসা ও অর্থনীতি, আইন, সামাজিক বিজ্ঞান, ভাষা, মনোবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, পরিবেশ ও জীবনবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসে ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, মিডিয়া ও ডিজাইন এবং সামাজিক বিজ্ঞানের মতো ব্যবহারিক ও পেশামুখী বিষয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালিত হয়।
ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম খুঁজতে সরকারি ‘Study in Austria’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যায়।
অস্ট্রিয়ায় উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা
অস্ট্রিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রোগ্রাম ও শিক্ষাস্তরভেদে আলাদা। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অ্যাডমিশন অফিস-এর সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।
ব্যাচেলর: নন-ইইউ/ইইএ দেশের শিক্ষার্থীদের ব্যাচেলর প্রোগ্রামে আবেদনের জন্য সাধারণত নিজ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা প্রদানকারী সমমানের মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক সনদ প্রয়োজন। অস্ট্রিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি জার্মান ভাষার দক্ষতার প্রমাণও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়।
তবে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের কিছু ব্যাচেলর প্রোগ্রামে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়-ভর্তি যোগ্যতার বদলে সংশ্লিষ্ট পেশাগত যোগ্যতাও গ্রহণ করা হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা, লিখিত বা মৌখিক মূল্যায়ন এবং সাক্ষাৎকার থাকে।
মাস্টার্স: মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমপক্ষে ছয় সেমিস্টারের ব্যাচেলর ডিগ্রি বা ১৮০ ইসিটিএস (ইউরোপীয়ান ক্রেডিট ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাক্যুমুলেশন সিস্টেম) ক্রেডিট থাকা আবশ্যিক।
পিএইচডি: পিএইচডি বা ডক্টরাল প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য সাধারণত গবেষণার প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা বা সমতুল্য অধ্যয়নের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।
ভাষাগত দক্ষতা
অস্ট্রিয়ার বেশির ভাগ প্রোগ্রাম জার্মান ভাষায় পরিচালিত হওয়ায় জার্মান ভাষার দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত প্রোগ্রামে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি ভাষার দক্ষতার প্রমাণ চাইতে পারে। IELTS, TOEFL বা অন্য কোনো ইংরেজি ভাষা পরীক্ষার নির্দিষ্ট স্কোর প্রয়োজন কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামের ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময় ও পদ্ধতি
সাধারণত দুটি মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্নাতক বা ডিপ্লোমা এবং মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলোতে ছাত্রছাত্রী ভর্তি নেওয়া হয়ে থাকে। একটি উইন্টার সেমিস্টার, যেটি শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে এবং আর সামার সেমিস্টার শুরু হয় ফেব্রুয়ারি থেকে। অবশ্য কোর্সভেদে প্রতি মৌসুমেই নিবন্ধনের সময়কাল ভিন্ন হয়ে থাকে। যা হালনাগাদ করা হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। এই অনলাইন পোর্টালগুলোর মাধ্যমে আবেদনের সামগ্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এ সময় আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র আপলোডের বিষয় থাকে।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত নথি যাচাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় বেশি সময় লাগতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবেদনের সাধারণ ধাপগুলো হলো -
১. পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম নির্বাচন করতে হবে।
২. সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে ভর্তি যোগ্যতা ও সময়সীমা দেখতে হবে।
৩. নির্ধারিত অনলাইন বা অন্য পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে।
৪. প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি জমা দিতে হবে।
৫. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভাষার দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।
৬. ভর্তি পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার থাকলে তাতে অংশ নিতে হবে।
৭. ভর্তি নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট ভর্তি-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করতে হবে।
ভর্তির আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- পাসপোর্ট এবং ছবি বা নামের সত্যতা প্রমাণে প্রার্থীর নিজের দেশের সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত যে কোনও পরিচয়পত্রের অনুলিপি
- সর্বশেষ ডিপ্লোমা বা হাই স্কুল সনদ পরীক্ষা বা ব্যাচেলর ডিপ্লোমার সনদ
- অ্যাপ্লাইড সায়েন্স ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক ডিগ্রির জন্য প্রাসঙ্গিক পেশাদার অভিজ্ঞতা
- ইংরেজি ভাষার দক্ষতা হিসেবে আইইএলটিএস, পিটিই একাডেমিক বা টিওইএফএল স্কোর কিংবা ক্যামব্রিজ সার্টিফিকেট
- জার্মান ভাষায় পাঠদানকৃত কোর্সের জন্য জার্মান ভাষার দক্ষতা প্রমাণপত্র
- এগুলোর পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আরও কিছু কাগজপত্র চাইতে পারে।
- বিদেশি শিক্ষাগত নথির মূল কপি ও অনুলিপি দিতে হয়। নথি জার্মান বা ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় হলে certified/legalised translation প্রয়োজন হতে পারে।
আবেদন পরবর্তী প্রক্রিয়া
কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে ব্যাচেলর স্তরে প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া হয়। যেটি সাধারণত একাডেমিক প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার ৬ মাস আগে হয়ে থাকে। অন্যান্য স্তরগুলোতে অনলাইনে (জুম বা স্কাইপে) মৌখিক পরীক্ষা বা ভর্তি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করা হয়। ভর্তি চূড়ান্ত হলে শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় ভর্তি-সংক্রান্ত নথি পাবেন। এরপর ছয় মাসের বেশি সময় অস্ট্রিয়ায় থাকার জন্য রেসিডেন্স পারমিট আবেদন করতে হবে।
অস্ট্রিয়ায় উচ্চশিক্ষার টিউশন ফি
অস্ট্রিয়ার বেশিরভাগ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণত প্রতি সেমিস্টারে ৭৫১.৯২ ইউরো টিউশন ফি দিতে হয়। ফলে দুই সেমিস্টারে বছরে টিউশন ফি দাঁড়ায় ১,৫০৩.৮৪ ইউরো। তবে স্কলারশিপ্রাপ্ত এবং কিছু দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে টিউশন ফি মওকুফ বা পুরো/আংশিক ফেরতের সুযোগ থাকতে পারে।
অস্ট্রিয়ায় জীবনযাত্রার খরচ
অস্ট্রিয়ায় একজন শিক্ষার্থীর গড় মাসিক জীবনযাত্রার খরচ বর্তমানে প্রায় ১,৩০০ ইউরো। সরকারি ‘Study in Austria’-এর হিসাবে আবাসনে আনুমানিক ৪৫০-৭০০, খাবারে প্রায় ৩০০ এবং পড়াশোনা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন, যাতায়াত, সংস্কৃতি ও বিনোদনসহ অন্যান্য খাতে প্রায় ৫০০ ইউরো ব্যয় হতে পারে।
শহর ও ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী এই ব্যয় কমবেশি হতে পারে। ভিয়েনার মতো বড় শহরে আবাসন ও অন্যান্য খরচ ছোট শহরের তুলনায় বেশি হতে পারে।
অস্ট্রিয়ার স্টুডেন্ট রেসিডেন্স পারমিট
ছয় মাসের বেশি সময় অস্ট্রিয়ায় থাকতে চাইলে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের রেসিডেন্স পারমিট প্রয়োজন। রেসিডেন্স পারমিট -এর আবেদন সাধারণত অস্ট্রিয়ায় যাওয়ার আগে Austrian Embassy New Delhi-তে ব্যক্তিগতভাবে জমা দিতে হয়। আবেদনটি পরে অস্ট্রিয়ার সংশ্লিষ্ট রেসিডেন্স অথোরিটির কাছে পাঠানো হয়।
রেসিডেন্স পারমিট আবেদনের ধাপ
আবেদন সাধারণত অস্ট্রিয়ায় যাওয়ার আগে নিজ দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত Austrian representative authority-তে করতে হয়। আবেদনটি অস্ট্রিয়ায় পাঠানোর পর সংশ্লিষ্ট রেসিডেন্স কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়। কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের জন্য নিজ দেশে অপেক্ষা করতে হয় বলে অস্ট্রিয়ান দূতাবাস অন্তত তিন মাস আগে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে।
আবেদন অনুমোদিত হলে দূতাবাস বা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীকে জানাবে। এরপর ভিসা প্রয়োজন হলে অস্ট্রিয়ায় প্রবেশের জন্য ‘ভিসা ডি’ নিতে হবে। রেসিডেন্স পারমিট অনুমোদনের খবর পাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে ভিসা ডি-এর আবেদন করতে হয়। অস্ট্রিয়ায় পৌঁছে সংশ্লিষ্ট রেসিডেন্স কর্তৃপক্ষ থেকে রেসিডেন্স পারমিট সংগ্রহ করতে হবে।
অস্ট্রিয়ায় পৌঁছানোর পর সাধারণভাবে তিন কর্মদিবসের মধ্যে স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন অফিসে বসবাসের ঠিকানা নিবন্ধন করতে হয়।
রেসিডেন্স পারমিট এর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সাধারণভাবে প্রয়োজন হয়-
* বৈধ পাসপোর্ট
* সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি
* অস্ট্রিয়ান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি-সংক্রান্ত নথি
* পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ
* স্বাস্থ্যবিমার প্রমাণ
* অস্ট্রিয়ায় থাকার উপযুক্ত আবাসনের প্রমাণ
* প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত নথি
স্কলারশিপের সুযোগ
এই অর্থের জোগানের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রিয়াতে রয়েছে পর্যাপ্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থা। যেমন- স্নাতক প্রোগ্রাম বা পিএইচডির জন্য দেওয়া হয় আর্নস্ট মাক গ্রান্ট ওয়ার্ল্ডওয়াইড স্কলারশিপ।
জনপ্রিয় স্পন্সর ইরাস্মাস মুন্ডাসের অধীনে থাকা প্রোগ্রামগুলোর পুরোটা সময়ের জন্য টিউশন ফি বহন করে। এই স্পন্সরশিপের মধ্যে রয়েছে ভিসা সংক্রান্ত খরচ, ভ্রমণ খরচ, বীমা, এবং মাসিক ভাতা।
ওইএডি (অস্ট্রিয়ান এজেন্সি ফর এডুকেশন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনালাইজেশন) অস্ট্রিয়ার প্রসিদ্ধ স্পন্সরগুলোর মধ্যে একটি। আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে নিজস্ব বৃত্তি প্রকল্প। যেমন - ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনা স্কলারশিপ বহন করে ১২,০০০ ইউরো (১৫ লাখ ৩৬ হাজার ৮১৪ টাকা)।
জয়েন্ট জাপান বিশ্বব্যাংক স্নাতক বৃত্তি প্রোগ্রামের আওতায় রয়েছে টিউশন ফি, মাসিক উপবৃত্তি, রাউন্ড-ট্রিপ বিমান ভাড়া, এবং স্বাস্থ্যবিমা। এই সুযোগ-সুবিধা দেয় অস্ট্রিয়ান ডেভেলপমেন্ট কলাবোরেশন স্কলারশিপ।
হেলমুট ভিথ স্টাইপেন্ড ফর ওমেন ইন কম্পিউটার সায়েন্স নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি। এটি টিউশন ফি, মাসিক উপবৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি পেশাদার দক্ষতা বিকাশের সুযোগ দেয়।
অস্ট্রিয়ায় অধ্যয়নকালীন আর্থিক ব্যবস্থাপনা
স্কলারশিপের পাশাপাশি অধ্যয়ন ও জীবনযাত্রার খরচ ব্যবস্থাপনার জন্য বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা খণ্ডকালীন চাকরি করতে পারে। তবে এর জন্য তাদেরকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হবে। অবশ্য ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্সিং-এর ক্ষেত্রে এই সরকারি নথির প্রয়োজন হয় না।
পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের জন্য ওয়ার্ক পারমিট পেতে অস্ট্রিয়ার কোনও একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে কাজের অফার পেতে হবে। কাজের অনুমতির জন্য এই জব অফার লেটারের সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রাপ্ত রেসিডেন্স পারমিটের নথি প্রদর্শন করতে হবে। এই নবায়ণযোগ্য ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ থাকে ১ বছর, যেখানে প্রতি সপ্তাহে কাজ করা যায় সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা।
জীবনযাত্রার খরচ বাঁচানোর জন্য শহরের কেন্দ্রের বাইরে অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শেয়ার করে কোনও অ্যাপার্টমেন্টে থাকা যেতে পারে। এগুলোর ভাড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের তুলনায় অনেকটা কম হয়। এখানে সমস্যা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই আবাসনগুলো বেশ দূরে হয়। এ ক্ষেত্রে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করা বেশ সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত স্টুডেন্ট কার্ড এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। এটি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পরিষেবাগুলোতে উল্লেখযোগ্য ছাড় পাওয়া যায়।
পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ
ডিগ্রি লাভের পর অস্ট্রিয়াতে স্থায়ী হওয়ার জন্য দুই ধরণের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে। একটি হচ্ছে চাকরি প্রার্থীদের জন্য রেসিডেন্স পারমিট এবং অন্যটি স্নাতকদের দেশে থাকা ও ফুল-টাইম কাজের জন্য লাল-সাদা-লাল কার্ড।
দুটি ক্যাটাগরিতেই স্নাতকরা এক বছর পর্যন্ত কাজ করার অনুমতি পান। তবে প্রথম ক্যাটাগরির জন্য ছাত্র অবস্থায় রেসিডেন্স পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে হয়। এর আওতায় প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়।
আর দ্বিতীয় ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করতে হয় কোনও চাকরির অফার পাওয়ার পর। আবেদনের পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রার্থীকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এই পারমিটে সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা থাকে সর্বোচ্চ ৪০ ঘণ্টা।
শেষ কথা
অস্ট্রিয়ায় উচ্চশিক্ষা মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এক অফুরন্ত সম্ভাবনার প্রবেশপথ। এই সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় দক্ষতা এবং ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। পাশাপাশি এই দুটি বিষয় নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার এবং বৃত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা। অস্ট্রিয়ার স্টুডেন্ট ভিসাপ্রাপ্তিও নির্ভর করে এই লেটার ও স্পন্সরশিপের উপর। তাই সঠিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে সক্রিয় থাকা আবশ্যক।