কীভাবে পিঁপড়ারা মিষ্টির খোঁজ পায়?

চা বা মিষ্টি খাওয়ার সময় কখনো কি ভেবেছেন, মেঝেতে পড়ে থাকা কয়েক দানা চিনি কিংবা এক ফোঁটা মিষ্টি পানীয়ের খোঁজ পিঁপড়ারা এত দ্রুত কীভাবে পেয়ে যায়? আশপাশে একটি পিঁপড়া না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যায় সারি বেঁধে হাজির হয়েছে পুরো দল। কিন্তু এত নিখুঁতভাবে খাবারের অবস্থান তারা কীভাবে শনাক্ত করে?

বিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে কাজ করে পিঁপড়াদের অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি, অ্যান্টেনা বা শুঁড় এবং রাসায়নিক সংকেতভিত্তিক এক অত্যন্ত সুসংগঠিত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই প্রাকৃতিক নেটওয়ার্কের সাহায্যেই তারা খাবারের অবস্থান শনাক্ত করে, অন্য পিঁপড়াদের খবর দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো দলকে সেখানে নিয়ে আসে। 

বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।  

যেভাবে শুরু হয় খাবারের অনুসন্ধান 

খাবারের সন্ধানে বের হওয়া পিঁপড়ারা ঘরের দেয়ালের ফাটল, জানালার কোণা, পাইপের পাশ কিংবা মেঝের কিনারা ধরে চলাফেরা করে। তাদের কাজ হলো আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য খাদ্যের উৎস খুঁজে বের করা।

মাইক্রোবায়োলজির গবেষণায় পিঁপড়াকে এমন এক প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অনুভূতির জগৎ মানুষের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষক শন কে. ম্যাকেঞ্জির নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিঁপড়ার জিনোমে অর্থাৎ জীবের সম্পূর্ণ জিনগত নির্দেশনার সমষ্টিতে গন্ধ শনাক্তকারী জিনের ব্যাপক প্রাচুর্য রয়েছে। 

এছাড়া ২০১২ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী PLOS Genetics-এ প্রকাশিত ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এক গবেষণায় বলা হয়, অন্যান্য অনেক পোকামাকড়ের তুলনায় পিঁপড়ার শরীরে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি ঘ্রাণ রিসেপ্টর রয়েছে। 

ফলে মানুষের কাছে একটি সাধারণ রান্নাঘর যতটা সাধারণ মনে হয়, পিঁপড়ার কাছে সেটি ততটাই অসংখ্য রাসায়নিক সংকেতে ভরা এক বিশাল জগৎ। কয়েক দানা চিনি, গুড়ের কণা, দুধের ফোঁটা, চায়ের দাগ, ঘি কিংবা সিঙ্কের আশপাশের আর্দ্রতা - সবই তাদের কাছে খাবারের সম্ভাব্য সংকেত। 

প্রজাতি ভিন্ন হলেও খাবার খোঁজার কৌশল একই

খাবারের সন্ধানে পিঁপড়ারা যে ব্যবস্থা ব্যবহার করে, তা রাসায়নিক সংকেত, স্মৃতিশক্তি এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক নেটওয়ার্ক। 

২০১৬ সালে ভারতের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির গবেষক হিমেন্দর ভারতী চীন ও জাপানের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত এক তালিকায় জানান, ভারতে পিঁপড়ার ৮২৮টি প্রজাতি ও উপপ্রজাতি রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালে তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় মানুষের বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ৩৪ প্রজাতির পিঁপড়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। 

তবে গবেষকদের মতে, আমাদের রান্নাঘরে দেখা যাওয়া পিঁপড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির নয়। প্রজাতি ভিন্ন হলেও খাবারের সন্ধান ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাদের আচরণ এবং জীবনযাত্রার ধাপগুলো প্রায় একই রকম।

কেন মিষ্টির প্রতি এতো আকর্ষণ 

পিঁপড়ারা তাদের কলোনির টিকে থাকা এবং শক্তির চাহিদা পূরণের জন্য মূলত মিষ্টিজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভর করে। উদ্ভিদের মিষ্টি রস, মধু, ফল কিংবা চিনি তাদের প্রধান শক্তির উৎস। 

২০২১ সালে গবেষক ডা. ওয়াকার জলিলের নেতৃত্বে ফায়ার অ্যান্ট নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণা ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন’-এ প্রকাশিত হয়। সেখানে পিঁপড়ার মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ, তাদের অ্যান্টেনায় থাকা স্বাদগ্রাহক বা টেস্ট রিসেপ্টর এবং সামনের পায়ের সংবেদনশীল অংশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরা হয়। 

গবেষণায় বলা হয়েছে, মিষ্টিজাতীয় খাবারের ঘ্রাণ বাতাসে খুব বেশি ছড়িয়ে পড়ে না। তাই তারা খাবারের খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর পর অ্যান্টেনা ও টেস্ট রিসেপ্টরের সাহায্যে তা শনাক্ত করে। এই টেস্ট রিসেপ্টর চিনির ক্ষুদ্রতম কণাও মুহূর্তেই চিনে ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা পিঁপড়ার শুঁড়ে থাকা এই স্বাদগ্রাহক ব্যবস্থাকে একটি প্রাকৃতিক ‘সার্চ ইঞ্জিন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। অনুসন্ধানী পিঁপড়ারা প্রথমেই সব খাবার খেয়ে ফেলে না। বরং অল্প পরিমাণ পরীক্ষা করে সেটি নিরাপদ কি না নিশ্চিত হয়, এরপর কলোনির অন্য সদস্যদের খবর দিতে ফিরে যায়।

রাসায়নিক সংকেতই তাদের জিপিএস’   

খাবারের সন্ধান পাওয়ার পর পিঁপড়া বাসায় ফেরার পথে শরীর থেকে ‘ফেরোমোন’ নামের বিশেষ এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। ফেরোমোন হলো প্রাণীদেহ থেকে নিঃসৃত এমন এক রাসায়নিক সংকেত, যা একই প্রজাতির অন্য সদস্যদের আকর্ষণ, সতর্ক বা নির্দেশনা দিতে ব্যবহৃত হয়। মার্কিন কৃষি বিভাগের অধীন কৃষি গবেষণা পরিষেবা জানিয়েছে, এই ফেরোমোনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া রাসায়নিক পথ অনেকটা আধুনিক জিপিএসের মতো কাজ করে। 

এ বিষয়ে ২০০৯ সালে Physiological Entomology জার্নালে প্রকাশিত গবেষক ই. ডেভিড মর্গানের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, খাবার খুঁজে পাওয়ার পর বাসায় ফেরার পথে পিঁপড়া যে ফেরোমোনের রেখা তৈরি করে, তা অনেকটা গুগল ম্যাপসের মতো পথনির্দেশকের কাজ করে। একই কলোনির অন্য পিঁপড়ারা সেই রাসায়নিক পথ অনুসরণ করেই সরাসরি খাবারের উৎসে পৌঁছে যায়।

শুঁড়ই পিঁপড়ার টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি  

পিঁপড়ার পুরো যোগাযোগব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো তাদের মাথার সামনের অ্যান্টেনা বা শুঁড়। গোয়ার ‘ফরেস্ট ইকোলজি রিসার্চ সেন্টার’- এর কীটতত্ত্ববিদ ব্রুনয় বাইথিয়ার জানান, পিঁপড়াদের ভাষা সম্পূর্ণ রাসায়নিক সংকেতের ওপর নির্ভরশীল। কোনো কারণে অ্যান্টেনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।  

তার ভাষায়, ফেরোমোনের রেখা তৈরি এবং সেই রাসায়নিক পথ শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করার মাধ্যমেই পিঁপড়েরা চারপাশ সম্পর্কে জানতে পারে, খাবারের সন্ধান পায়, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের কলোনিতে বসবাসকারী অন্যান্য পিঁপড়াদের সঙ্গেও এর মাধ্যমেই তাদের পরিচয় হয়।এমনকি কোনো বড় খাবার একা বহন করা সম্ভব না হলে এই রাসায়নিক ‘জিপিএস’ ব্যবস্থার মাধ্যমেই তারা পুরো দলকে সেখানে নিয়ে আসে।

মেঝেতে পড়ে থাকা কয়েক দানা চিনি বা এক ফোঁটা মিষ্টি পানীয় মানুষের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও পিঁপড়াদের কাছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যের সংকেত। অসাধারণ ঘ্রাণশক্তি, টেস্ট রিসেপ্টরসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সার্চ ইঞ্জিন এবং ফেরোমোনভিত্তিক রাসায়নিক জিপিএস - এই তিন ব্যবস্থার সমন্বয়েই তারা দ্রুত খাবারের অবস্থান শনাক্ত করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই কলোনির অন্য পিঁপড়ারা খাবার পর্যন্ত পৌঁছায়।