অনেক শিশু পড়াশোনায় ভালো হলেও গণিতের ক্ষেত্রে বারবার সমস্যায় পড়ে। সংখ্যা মনে রাখা, যোগ-বিয়োগ করা কিংবা সহজ হিসাব বুঝতেও তাদের তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। অনেক সময় অভিভাবকরা বিষয়টিকে শিশুর অমনোযোগ, অলসতা বা পড়াশোনায় অনীহা বলে ধরে নেন। কিন্তু এর পেছনে থাকতে পারে ‘ডিসক্যালকুলিয়া’ নামক সমস্যা।
‘ডিসক্যালকুলিয়া’ থাকা মানেই শিশু কম মেধাবী - এমন নয়। বরং স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা থাকা সত্ত্বেও সংখ্যার ধারণা ও গাণিতিক সমস্যা সমাধানে শিশুর বিশেষ ধরনের অসুবিধা হতে পারে। সময়মতো বিষয়টি বুঝতে পারলে উপযুক্ত সহায়তা ও শেখানোর পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুকে অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ডিসক্যালকুলিয়া কী?
ডিসক্যালকুলিয়া শব্দের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৪৯ সাল থেকে। এই শব্দটি গ্রিক শব্দাংশ ‘dys’ (যার অর্থ খারাপ) এবং ল্যাটিন শব্দ ‘calculare’ (যার অর্থ গণনা করা) এর সমন্বয়ে গঠিত, যার সামষ্টিক অর্থ ‘খারাপভাবে গণনা করা’।
সংখ্যা সম্বন্ধীয় সাধারণ তথ্য বা গণিতের পদ্ধতি মনে রাখতে না পারা, ধীরগতিতে অঙ্ক করা ইত্যাদি শিক্ষা সম্বন্ধীয় বিকারকে ডিসক্যালকুলিয়া বলা হয়। ডিসক্যালকুলিয়া আক্রান্ত শিশুদের প্রধান সমস্যা হলো গণিতের মূল ধারণা অনুধাবন করতে না পারা। গণিত কীভাবে কাজ করে তা অনুধাবন করতে তাদের সমস্যা হয়। তাদের কেউ কেউ হয়তো গণিতে কী করতে হবে তা শিখতে পারে, কিন্তু এটা বুঝতে পারে না যে কেন করতে হবে। অর্থাৎ তারা পেছনের যুক্তি বুঝতে পারে না। আবার কেউ কেউ গণিতের পেছনের যুক্তি বুঝতে পারলেও তা কখন ও কোথায় ব্যবহার করতে হবে তা নির্ণয় করতে পারে না। মনে রাখা দরকার, এসব শিশু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নয়। ধারণা করা হয়, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ৫%-৭% এর মধ্যে ডিসক্যালকুলিয়া থাকতে পারে।
কারণ
ঠিক কী কারণে ডিসক্যালকুলিয়া হয় তা এখনো গবেষকদের কাছে পরিষ্কার নয়। এটি শিশুর অলসতা, কম বুদ্ধিমত্তা বা অভিভাবকের ভুল লালন-পালনের কারণে হয় না। তবে সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
জিনগত কারণ
বিভিন্ন জিনগত ব্যাধি, যেমন: টার্নারস সিনড্রোম, ফ্র্যাজাইল এক্স সিনড্রোম, ভেলোকার্ডিওফেসিয়াল সিনড্রোম, উইলিয়াম’স সিনড্রোমের কারণে শিশুদের মধ্যে ডিসক্যালকুলিয়া দেখা দিতে পারে।
পরিবেশগত কারণ
গর্ভাবস্থায় মায়ের মদ্যপান কিংবা মাদকদ্রব্য গ্রহণ নবজাতকের ডিসক্যালকুলিয়ায় আক্রান্ত হওয়াকে ত্বরান্বিত করে।
শিশুদের মধ্যে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়
স্কুল শুরু হওয়ার আগে
- সংখ্যা গণনা করতে অসুবিধা হওয়া
- একই বয়সের অন্য শিশুদের তুলনায় সংখ্যা মনে রাখতে সমস্যা হওয়া
- সংখ্যার প্রতীকগুলো বুঝতে অসুবিধা হওয়া
- বইয়ে মূদ্রিত সংখ্যা চিনতে অসুবিধা হওয়া
- সংখ্যার প্রতীক ও কথায় লিখিত রূপের মধ্যে সামঞ্জস্য করতে না পারা
- সংখ্যাজ্ঞানের সাথে বাস্তব জীবনের উপমার সম্পর্ক স্থাপন না করতে পারা
- বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন, আকার বা সংখ্যাগত ছন্দের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারা
স্কুলের প্রাথমিক এবং মধ্যস্তরে
- সংখ্যা এবং চিহ্ন চিনতে না পারা।
- সাধারণ গাণিতিক প্রক্রিয়াসমূহ, যেমন: যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করতে না পারা।
- শব্দের মাধ্যমে ব্যক্ত গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে না পারা।
- কোনো বস্তুর পরিমাপ, যেমন: দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নির্ণয় করতে না পারা।
- সময় বলতে অসুবিধা হওয়া।
- মৌখিক গণিত বা মানসাংক করতে সমস্যা হওয়া।
- টেলিফোন নাম্বার মনে রাখতে অসুবিধা হওয়া।
- মাধ্যমিকে পড়েও ছোট ছোট যোগ-বিয়োগের জন্য হাতের ব্যবহার করা।
- যুক্তি এবং পরিকল্পনা প্রয়োজন এমন কোনো খেলায় অংশগ্রহণ না করা।
প্রাপ্তবয়স্ককালে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়
- দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ বা যোগ করতে না পারা
- উচ্চ পর্যায়ের গাণিতিক সমস্যা বুঝতে না পারা
- স্থান, কাল এবং দূরত্বের সংজ্ঞা বুঝতে না পারা
- একই সমস্যার বিভিন্ন সমাধান বের করতে না পারা
- ফোন নম্বর, লগইন আইডি, তারিখ মনে রাখতে না পারা
- দৈনন্দিন হিসাবে সমস্যা হওয়া। যেমন বাজারের মোট খরচ বা ফেরত টাকার হিসাব, রেস্তোরাঁয় বিল ভাগ করা, রান্নার রেসিপিতে বেশি লোকের জন্য কতটা পরিমাণ বাড়াতে হবে, তা বুঝতে না পারা
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, চেকবুক, ক্রেডিট কার্ডের পেমেন্টের হিসাব রাখা বুঝতে অসুবিধা
শুধু গণিতে কম নম্বর পেলেই কি ডিসক্যালকুলিয়া?
না। একটি পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া বা গণিত অপছন্দ করা মানেই ডিসক্যালকুলিয়া নয়।
গণিত শেখার সমস্যা বিভিন্ন কারণেও হতে পারে। যেমন - ভিত্তি দুর্বল হওয়া, শেখানোর পদ্ধতি শিশুর উপযোগী না হওয়া, অনুশীলনের অভাব, উদ্বেগ বা মনোযোগের সমস্যা। ডিসক্যালকুলিয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিশুর সমস্যাগুলো কতটা স্থায়ী এবং বয়স অনুযায়ী তার গাণিতিক দক্ষতা প্রত্যাশার তুলনায় কতটা পিছিয়ে - এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়।
করণীয়
প্রথমেই শিশুকে বকাঝকা বা অন্য শিশুদের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। এতে গণিত নিয়ে ভয় ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। বরং -
খেলার ছলে অঙ্ক বোঝানো: শিশুকে সাধারণ জিনিস, যেমন: ফল, সবজি, বাসন, খেলনা ইত্যাদির সাহায্যে সংখ্যার ধারণা বোঝানো যেতে পারে। যেহেতু অঙ্ক সাধারণ জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই শিশুকে টাকা-পয়সার হিসাব, সময় ও গতির সঙ্গে গণিতের সম্পর্কে বোঝাতে হবে।
উৎসাহ এবং সহযোগিতা প্রদান: শিশুর ভালো বৈশিষ্ট্য এবং গুণ নিয়ে তার সাথে কথা বলতে হবে। নিজের পছন্দসই কাজ করতে উৎসাহিত করতে হবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
ডিসক্যালকুলিয়া সম্পর্কে সচেতনতা: যেকোনো শিখন অক্ষমতার ব্যাপারে সচেতনতাই সেটি নিরাময়ের প্রধান পূর্বশর্ত। তাই অভিভাবকের উচিত শিশুকে বোঝানো, যে তার সমস্যা সম্পর্কে তারা সচেতন আছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষের সহায়তা কামনা: অভিভাবকের উচিত শিক্ষকদেরকে শিশুর সমস্যার কথা জানিয়ে সাহায্য চাওয়া। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু হিসেবে ডিসক্যালকুলিয়ায় আক্রান্ত শিশুর কিছু বিশেষ সুবিধা প্রাপ্য। এগুলো হলো - পরীক্ষায় একটু বেশি সময় প্রদান কিংবা ক্যালকুলেটর ব্যবহারের সুযোগ প্রদান ইত্যাদি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া: যেকোনো ধরনের শিখন বৈকল্য শিশুর ব্যক্তিত্ব এবং আত্মবিশ্বাসকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।ফলে সে উদ্বেগ এবং মানসিক চাপে ভুগতে পারে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে এই সমস্যার সাথে মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যাটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সুযোগ তৈরি করা। সঠিক সহায়তা পেলে ডিসক্যালকুলিয়ায় থাকা শিশুও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ করতে পারে।