বিদেশ ভ্রমণে বাড়তি খরচ এড়াতে আগে থেকেই যা করবেন

বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, কিন্তু বাজেটের হিসাব মিলছে না - এ অভিজ্ঞতা অনেকেরই। বিমান টিকিটের দাম, ভিসা, হোটেল, খাওয়া ও ঘোরাঘুরি মিলিয়ে শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা ধরে নিতে হয়। তবে বিদেশভ্রমণ মানেই যে বিপুল খরচ, তা নয়। কোথায় কখন টাকা খরচ করছেন এবং কোন সেবার জন্য কত দিচ্ছেন - সেটি একটু পরিকল্পনা করে দেখলেই অনেকটা সাশ্রয় করা সম্ভব।

বিমান টিকিটের দাম কমানো থেকে শুরু করে কম খরচে থাকার জায়গা বেছে নেওয়া, বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার ব্যবস্থা কিংবা দর্শনীয় স্থানের টিকিট কেনা - প্রতিটি ধাপেই রয়েছে খরচ কমানোর সুযোগ। এমনকি খাবারের ক্ষেত্রেও কিছুটা হিসাব করে চললে ভ্রমণের মোট বাজেট রাখা যায় নাগালের মধ্যে।

আগাম পরিকল্পনা ও টিকিট সাশ্রয়ের উপায়

ভ্রমণের তারিখ আগেভাগে ঠিক করে ফেললে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের টিকিটের দর যাচাই করার সুযোগ মেলে। বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত এয়ারলাইনসগুলো প্রায়ই নানা ধরনের আকর্ষণীয় ছাড় দেয়। এসব অফারের খবর সবার আগে পেতে পছন্দের এয়ারলাইনসের ই-মেইল নিউজলেটার বা প্রচারণামূলক বার্তা সাবস্ক্রাইব করে রাখা বেশ কার্যকর।

ভ্রমণের তারিখ যত আগে নির্ধারণ করা যাবে, টিকিটের দাম তুলনার জন্য তত বেশি সময় পাওয়া যাবে। ঠিক শেষ মুহূর্তে টিকিট কাটতে গেলে ভাড়ার চড়া মাশুল গোনার ঝুঁকি থাকে।

সাধারণ ট্রাভেল এজেন্সির বাইরে ‘গোযায়ান’-এর মতো অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) কিংবা আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রিপ ডটকম’-এর অফারগুলোতেও চোখ রাখা উচিত। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্ড ব্যবহার করে এসব প্ল্যাটফর্মে আরও বাড়তি ছাড় বা ক্যাশব্যাক সুবিধা পাওয়া যায়।

তবে কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সরকারি বিধিমালা জেনে নেওয়া জরুরি। বর্তমানে নিয়ম অনুযায়ী, কার্ডে অনলাইন কেনাকাটায় ৩০০ ডলারের বেশি অঙ্কের টিকিট বুক করতে হলে আগেই ব্যাংকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

ভিসার খরচ

বিদেশভ্রমণের প্রস্তুতিতে ভিসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো কোনো দেশের ভিসার আবেদন নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে করতে হয়। আবার কিছু দেশের ক্ষেত্রে আবেদনকারী নিজেই অনলাইনে বা নির্ধারিত ভিসা সেন্টারে আবেদন করতে পারেন। নিজে আবেদন করার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদনপ্রক্রিয়া ভালোভাবে জেনে সরাসরি আবেদন করা যায়। এতে এজেন্সির সার্ভিস চার্জের খরচ বাঁচতে পারে।

ভিসার নিয়ম দেশভেদে আলাদা। এ বিষয়ে ইউটিউবে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ভিসার আবেদন করার সময় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস, কনস্যুলেট বা সরকারি ভিসা ওয়েবসাইটের সর্বশেষ নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।

বিমানবন্দর থেকে হোটেল

নতুন দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার খরচও ভ্রমণ বাজেটে প্রভাব ফেলে। বেশির ভাগ শহরের বিমানবন্দর মূল শহর থেকে দূরে হওয়ায় ট্যাক্সি বা ব্যক্তিগত গাড়িতে গেলে খরচ বেড়ে যেতে পারে। দেশভেদে এই যাতায়াতে ৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

তাই ভ্রমণের আগেই বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার ব্যবস্থা ঠিক করে রাখা ভালো। কোথাও মেট্রো, কোথাও বাস বা শাটল সার্ভিস থাকে। এসব পরিবহনে ট্যাক্সির তুলনায় কম খরচে শহরে পৌঁছানো যায়।

কিছু হোটেল বিমানবন্দর থেকে বিনামূল্যে বা নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে। হোটেল বুকিংয়ের সময় এই সুবিধা আছে কি না, সেটিও দেখে নেওয়া যেতে পারে।

হোটেল বুকিং

‘বুকিং ডটকম’, ‘অগোডা’ কিংবা ‘ট্রিপ ডটকম’-এর মতো জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে খুব সহজেই নির্দিষ্ট কোনো এলাকার বিভিন্ন হোটেলের ভাড়া, অবস্থান, সুযোগ-সুবিধা এবং পূর্ববর্তী অতিথিদের রিভিউ বা পর্যালোচনা দেখে নেওয়া যায়। ভ্রমণের অন্তত মাসখানেক আগে খোঁজ নিলে সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের হোটেল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

তবে হোটেল নির্বাচনে শুধু কম ভাড়া দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক নয়। হোটেলের সঠিক অবস্থান, আশপাশের পরিবহন ব্যবস্থা এবং দর্শনীয় জায়গাগুলোতে যাতায়াত কতটা সুবিধাজনক - এসব দিকও সমভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।

অনেকে খরচ বাঁচাতে শহরের একদম প্রান্তসীমায় কম দামি হোটেল বুক করে থাকেন। কিন্তু এতে সমস্যা হলো - প্রতিদিন মূল শহরে বা দর্শনীয় স্থানে আসা-যাওয়ার পেছনেই চড়া মাশুল গুনতে হয়। ফলে হোটেলে যে টাকা সাশ্রয় হয়, তার চেয়েও বেশি অর্থ বেরিয়ে যায় যাতায়াত খরচে। তাই পরিবহন ব্যবস্থার কাছাকাছি এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সহজে যাতায়াত করা যায় - এমন সুবিধাজনক অবস্থানের হোটেল বেছে নেওয়াটাই প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে লাভজনক কৌশল।

ট্যুর ও দর্শনীয় স্থান

বিদেশে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, জাদুঘর, রাইড কিংবা ডে-ট্যুরের জন্য আলাদা টিকিট কিনতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে আগে থেকে অনলাইনে টিকিট কিনলে ছাড় পাওয়া যায়। আবার একাধিক আকর্ষণ একসঙ্গে নিয়ে কম্বো প্যাকেজও পাওয়া যায়।

Klook-এর মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন গন্তব্যের ট্যুর, আকর্ষণের টিকিট ও রাইডের প্যাকেজ পাওয়া যায়। তবে বুকিংয়ের আগে একই সেবার দাম সংশ্লিষ্ট আকর্ষণের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও দেখে নেওয়া ভালো। কোন প্যাকেজে কী কী সুবিধা অন্তর্ভুক্ত, বাতিলের নিয়ম কী এবং অতিরিক্ত কোনো চার্জ আছে কি না - এসব বিষয়ও আগে দেখে নেওয়া দরকার।

খাবারের খরচ কমানোর সহজ কৌশল

ভ্রমণ বাজেটের একটা বড় অংশই চলে যায় খাওয়ার পেছনে। তাই হোটেল বুক করার সময় রুমের সাথে সকালের নাশতা অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, তা দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে দিনের একটি বেলার খাবারের চিন্তা ও খরচ - দুটোই একবারে বেঁচে যায়।

দুপুর বা রাতের খাবারের জন্য প্রতিদিন পর্যটন এলাকার চড়া দামি রেস্তোরাঁয় না গিয়ে লোকাল ফুড শপ বা সাধারণ রেস্তোরাঁ বেছে নেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন খরচে বড় ছাড় পাওয়া যায়, তেমনি স্থানীয়দের আসল খাবারের স্বাদ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও মেলে।

এছাড়া ভ্রমণের সময় বিমানবন্দরে কার্ডের ফ্রি লাউঞ্জ সুবিধা ব্যবহার করেও খাবারের খরচ কিছুটা কমিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে লাউঞ্জ অ্যাকসেস সব কার্ডে একরকম থাকে না; ব্যাংক ও কার্ডের ক্যাটাগরিভেদে এটি ভিন্ন হয়। তাই দেশ ছাড়ার আগেই নিজের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে কী কী লাউঞ্জ সুবিধা প্রযোজ্য, তা ব্যাংক থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।

বিদেশভ্রমণে খরচ কমাতে গিয়ে বিশাল কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই; প্রতিটি ক্ষেত্রে একটু সচেতন আর হিসাবী হওয়াই যথেষ্ট। ভ্রমণের বেশ কিছু দিন আগে থেকেই গন্তব্য, টিকিট, ভিসা প্রসেসিং, হোটেল বুকিং, অভ্যন্তরীণ যাতায়াত, দর্শনীয় স্থান ও খাবারের খাতগুলোতে একটু সময় নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ভ্রমণের পরিকল্পনাটা গোছানো ও বাস্তবসম্মত হলে পকেটের ওপর চাপ না ফেলে বাজেটের মধ্যেই স্বপ্নপূরণ করা সম্ভব।