পৃথিবীর অপার রহস্যে ঘেরা যে কয়েকটি অঞ্চল বিশ্বজুড়ে মানুষের কৌতূহলের তুঙ্গে রয়েছে, তার অন্যতম তিব্বত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে প্রায় ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চলটিকে বলা হয় পৃথিবীর ছাদ। হিমালয়ের উত্তরে বছরের প্রায় ৮ মাস বরফে আবৃত থাকা তিব্বতের দুর্গম প্রকৃতি ও রহস্যময় সংস্কৃতি বহু শতক ধরে বহির্বিশ্ব থেকে একে আড়াল করে রেখেছে।
বাস্তবতায় সমগ্র তিব্বত নিষিদ্ধ না হলেও এর রাজধানী লাসা দীর্ঘকাল বহিরাগতদের জন্য পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকায় সমগ্র অঞ্চলটিই ‘নিষিদ্ধ দেশ’ হিসেবে খ্যাতি পায়। তিব্বতি ভাষায় লাসা শব্দের অর্থ ‘ঈশ্বরের স্থান’। তিব্বতিদের জীবনে ধর্ম একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। তিব্বত মূলত পৃথক কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত নয়; এটি চীনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ১৯১২ সালে তিব্বত নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে দালাইলামার নেতৃত্বে চীনের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলন ব্যর্থ হয়।
লাসার প্রধান আকর্ষণ ও বৌদ্ধ ধর্মগুরু দালাইলামার ঐতিহাসিক বাসভবন হলো পোতালা প্রাসাদ, যার চূড়া সোনার তৈরি বলে প্রচলিত রয়েছে। ১৯০৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় ছবি প্রকাশের মাধ্যমে বিশাল এই প্রাসাদটি প্রথম বিশ্ববাসীর নজরে আসে। শহরজুড়ে রয়েছে অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির ও প্রাচীন ধর্মীয় স্মারক, যার মধ্যে চার হাজার ভরি ওজনের একটি ঐতিহাসিক প্রদীপও অন্তর্ভুক্ত।
তিব্বতিদের জীবনযাত্রা ও আচার-অনুষ্ঠানে রয়েছে অদ্ভুত কিছু বৈচিত্র্য। বিশেষ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও আত্মায় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত অনুরাগী। কোনো মানুষের মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গেই তার সৎকার করা হয় না; বিশ্বাস করা হয় আত্মা কিছুকাল এই জগতে বিচরণ করে। ফলে অতিক্ষণ মৃতদেহ পরম শ্রদ্ধায় বাসায় রেখে দেওয়া হয়।
বিপজ্জনক আবহাওয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে শত শত বছর অচেনা থাকার পর ১৯৮০ সালে পর্যটকদের জন্য তিব্বত ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে আকাশপথ, রেলপথ ও সড়কপথে সহজেই সেখানে যাওয়া সম্ভব।
প্রকৃতির পরম শান্তি ও হাজার বছরের ইতিহাসকে সঙ্গী করে স্বকীয় ঐতিহ্য ধারণ করে রাখা তিব্বত আজও বিশ্বের আনাচে-কানাচের ভ্রমণপিপাসুদের জন্য পরম এক রোমাঞ্চকর গন্তব্য।



