পঞ্চমীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। তবে, এবছর সপ্তমী তিথি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন অনেক ভক্ত। কারণ, পঞ্জিকা অনুযায়ী এবার সপ্তমী পড়েছে দুই দিন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুইদিন মহাসপ্তমী, সোমবার ( ১৯ অক্টোবর) অষ্টমী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মহানবমী এবং বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর মাধ্যমে বিদায় নেবেন দুর্গা দেবী। এবার দেবী বিদায় নেবেন নৌকায়।
হিন্দু শাস্ত্রমতে, সূর্যোদয়ের সময় যে তিথি থাকে, সারাদিন সেই তিথি ধরা হয়। তিথির সময়কাল ২৪ ঘণ্টার বেশি হওয়ায় দুই দিনের (শনিবার, ১৭ অক্টোবর ও রবিবার ১৮ অক্টোবর) সূর্যোদয়ই পাচ্ছে সপ্তমী তিথিকে।
শাস্ত্র অনুযায়ী, দুই দিন সপ্তমী থাকলেও উৎসবের ক্ষণ গণনায় কোনো প্রভাব পড়বে না। ভক্তরা মহাসপ্তমীর দিনই অঞ্জলি দিতে পারবেন।
হিন্দু পঞ্জিকায় তিথির হিসাব চন্দ্রের গতির ওপর নির্ভর করে। কোনও কোনও বছর একটি তিথি দুই ক্যালেন্ডার দিনে বিস্তৃত হয়। ফলে ভক্তরা দুই দিনই মহাসপ্তমীর পূজা, অঞ্জলি ও আরাধনা করতে পারবেন।
ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা জানান, সপ্তমী দুইদিন হওয়ার কারণ হচ্ছে, এটাকে আমাদের ব্রহ্ম মুহূর্ত বলে। ভোরবেলা ওই মুহূর্ত টাচ করতে হয়, নাহলে পূজা সপ্তমী শেষ হয় না।
পুরোহিত দেব্দাস গোস্বামী জানান, এই তিথিটা যখন সংযোগ হয় কোন কোন সময় একই তিথি দেখা গেছে টাইমের সমস্যার কারণে একাত্রিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে, বুধবার ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এ উৎসব। এদিন বিকাল ৩টায় রাজধানীসহ সারা দেশে বিজয়ের শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
ষষ্ঠী পূজায় বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে ষষ্ঠাধী কল্পারম্ভ, ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে মা কে মন্দিরের আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়। পরদিন বিল্ব বৃক্ষের নিচে মাকে স্নান করে মন্দিরে স্থাপন করা হবে। ষষ্ঠী পূজা সম্পন্নের মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হয় বলে জানিয়েছেন পুরোহিতরা।
বোধনের পর সাধারণত খুলে দেওয়া হয় মণ্ডপ। এর মাধ্যমে দেবী জেগে উঠেন আর তাতে দর্শন করা যায় দেবীর। শাস্ত্রমতে মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে (ষোল উপাদানে) দেবীর পূজা হবে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হয়। একই সঙ্গে দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। এসময় পূজারীরা মায়ের সামনে বসে মায়ের মুখ দর্শন করতে পারেন।
অষ্টমীতে কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা হয়। এদিন রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরে সকাল সাড়ে ৯টায় কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কুমারী বালিকার মধ্যে বিশুদ্ধ নারীর রূপ কল্পনা করে তাকে দেবী জ্ঞানে পূজা করেন ভক্তরা। অষ্টমীর দিন বিশেষ আকর্ষণ থাকে কুমারী পূজা এবং সন্ধিপূজায়।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত ১ থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবী জ্ঞানে পূজা করা হয়।
শ্রীরাম কৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য।
শাস্ত্রমতে, এক বছর বয়সী কন্যাকে সন্ধ্যা, দুইয়ে সরস্বতী, তিনে ত্রিধামূর্তি, চারে কলিকা, পাঁচে সুভাগা, ছয়ে উমা, সাতে মালনী, আটে কুজ্বিকা, নয়ে কালসন্দর্ভা, দশে অপরাজিতা, এগারোয় রুদ্রানী, বারোয় ভৈরবী, তেরোয় মহালক্ষ্মী, চোদ্দতে পীঠ নায়িকা, পনেরোতে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরে তাকে অন্নদা নামে অভিহিত করা হয়।
নির্বাচিত কুমারীকে মহাষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে (ষোলো উপাদান) দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। এ সময় চারদিকে শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বোল, উলুধ্বনি আর দেবী স্তুতিতে মুখর হয়ে ওঠে।
নবমীতে মণ্ডপে ভেসে আসে বিষাদের সুর। কারণ, দেবী দুর্গার বিদায়ের ঘণ্টা বাজে নবমী পূজায়। দশমীর দিন কৈলাসে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা।
বিজয়া দশমীর দিন করা হয় প্রতিমা বিসর্জন। অশ্রুশিক্ত চোখে ভক্তরা বিদায় দেবেন দেবী দুর্গাকে। এভাবেই শেষ হয় শারদীয় দুর্গাপূজা।