পনেরটি ঘর, পনেরজন মা আর তাদের সন্তানদের নিয়ে একেকটি পরিবার। এই সন্তানদের কাউকেই গর্ভে ধারণ করেননি তারা। তবে ধারণ করে রেখেছেন হৃদয়ে। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু পরম মমতায় আগলে রেখেছেন সন্তানদের। এমন দৃশ্যের দেখা মেলে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত এসওএস চিলড্রেন ভিলেজে। এটি অনাথ এবং অসহায় শিশুদের জন্য একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। দেশজুড়ে তাদের মোট ছয়টি শাখা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি ১৯৪৯ সালে যাত্রা শুরু করে। বাংলাদেশে তাদের পথচলা শুরু ১৯৭২ সালে।
মিরপুরের এসওএস চিলড্রেন ভিলেজ “দিশারী”, “সোনালি” আর “মমতা” নামে তিনটি পাড়ায় বিভক্ত।
আর দশজন মায়ের মতো এসওএস-এর মায়েদেরও সকালের প্রথম ব্যস্ততা সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাদের বাচ্চারা পড়তে যায় এসওএস হারম্যান মেইনার স্কুলে।
মায়েদের একজন রোকেয়া (ছদ্মনাম) ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি এখানে ২০ বছর ধরে আছি। প্রতিদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই বাচ্চাদের স্কুলের টিফিনের ব্যবস্থা করি। ওদের স্কুলে পাঠিয়ে, রান্না শুরু করি দুপুরের খাবারের জন্য। ফিরে এলেই তাদের খেতে দেই। খাওয়া-দাওয়া শেষে তারা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়তে বসে। নতুন শিশুদের এখানে এসে কিছুদিন সময় লাগে খাপ-খাওয়াতে। তবে শিশুরা খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়।”
এই চিলড্রেন ভিলেজে শিশুদের একাকিত্বে ভোগার সুযোগ নেই।
“এখানে তাদের অনেক ভাই-বোন আছে। তাদের পেয়ে নতুন শিশুরা অনেক তাড়াতাড়ি মিশে যায়। আমার অনেক সন্তানই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারা এখন আর এখানে নেই। অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে। অনেকে অন্য জায়গায় থাকে। ওদের জন্য মন খারাপ হয়। তবে ওরা বিভিন্ন প্রোগ্রামে এখানে আসে বেড়াতে।”
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, “আমাদের শিশুরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে থাকে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুদান আসে মূলত ইউরোপ-ভিত্তিক দেশগুলো থেকে।”
তাদের প্রতিষ্ঠানে কোত্থেকে শিশুরা আসে জানতে চাইলে আনিসুর বলেন, “এসব শিশুরা অনেকেই বাবা মা ছাড়া, অনেকেই আসে ছোটমনি নিবাস থেকে আসে, অনেকেই সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও এখানে পাঠানো হয়। আমাদের মায়েরা এখানে সারাক্ষণ থাকে। অনেক শিশুর দাদা-দাদি বা কোনো নিকটাত্মীয় থাকলে কখনো কখনো তাদের কাছে বেড়াতে পাঠানো হয়। অনেক দম্পতির বিচ্ছেদের পর কোনো পক্ষই সন্তানকে নিতে চায় না, তখন শিশুরা আসে এখানে।”
সৌজন্য ছবিএসওএস-এ শিশুদের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি রয়েছে খেলাধুলা, গান, নাচের মতো বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম। এতে শিশুরা প্রকাশ ও বিকাশের সুযোগ পায়।
কথা হয় এসওএস পরিবারের থাকা রাতুলের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তার কথায়, “আমি প্রতিদিন গাড়ি করে স্কুলে যাই। এখন ছুটি চলছে। বিকেলে মাঠে খেলি।”
রাকিব (ছদ্মনাম) নামে আরেক শিশুর অভিজ্ঞতা, “আমাদের প্রতিদিন প্রাইভেট শিক্ষক আসেন। শিক্ষক চলে গেলে আমি খেলাধুলা করি। এরপর টেলিভিশন দেখি। মাঝে মাঝে কম্পিউটারে কার্টুন দেখি।”
এখানকার শিশুরা বড় হয়ে পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিষয়ে আনিসুর রহমান বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরা এখানে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত থাকার সুযোগ পায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কার্যক্রমেরও সুযোগ রয়েছে।”
মা রোকেয়া বলেন, “ঈদ, বড়দিন, পূজা সব উৎসব একসাথে বাচ্চাদের নিয়ে পালন করি। বাচ্চারা খুশি মনে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এছাড়া আমরা সবাই মিলে বিভিন্নরকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করি।”
বসবাসরত শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও বেশ সচেতন এসওএস কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক হাছিনা পারভীন বলেন, “আমাদের শিশুরা এমন একটা পরিবেশে থাকে যেখানে তাদের মানসিক সমস্যা হওয়ার সুযোগ খুব কম। প্রতিটি শিশুর জন্য আমাদের একটা পরিকল্পনা থাকে। সেই অনুযায়ী তাদের লেখাপড়ারও ব্যবস্থা করা হয়। তুলনামূলক বড় শিশুদের পরিবার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয় প্রথমেই। তবে একেবারে ছোট অবস্থায় যারা আসে তাদের বোঝাতে একটু কষ্ট হয়।”
তিনি আরও বলেন, “শিশুরা তাদের মা এবং ভাই-বোনদের নিয়ে বেশ আনন্দেই থাকে। আমরা এভাবেই তাদের পরিবারের অভাব পূরণের চেষ্টা করি। তবুও কোনো শিশুর মাঝে মানসিক সমস্যা দেখতে পেলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিই। সেক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসাও করানো হয়।”