ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির ১০ বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান

“ভারতবর্ষের” সমৃদ্ধ ইতিহাসে নানা ইতিহাস আর ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে আছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। দেবনগরী নামে খ্যাত এই ঐতিহাসিক শহর বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর। দিল্লি এখন শৈল্পিক ও প্রযুক্তিগত দর্শনীয় স্থানেরও প্রাণকেন্দ্র।

হাজার সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্র দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একদিনের ক্রিকেট বিশ্বকাপ। অনেকে বিশ্বকাপ দেখতে ভারতে অবস্থান করছেন। অনেকে হয়তো যেতে পারেন। খেলা উপভোগের পাশাপাশি ঘুরে আসতে পারেন দিল্লির দর্শনীয় স্থানগুলো। নিচে দিল্লির ১০টি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থানের খোঁজ দেওয়া হলো-

অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম

পূর্বে ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম নামে পরিচিত এই ক্রিকেট ভেন্যুর প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৮৩ সাল। নয়াদিল্লির বাহাদুর শাহ জাফর মার্গে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে এবার ক্রিকেট বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে শ্রীলঙ্কার।

মাঠটি দিল্লির সেরা কিছু দর্শনীয় স্থানের কাছাকাছি হওয়ায় দিল্লি ভ্রমণটা ষোলো আনা পুষিয়ে নেওয়া যেতে পারে। লাল কেল্লা, পুরান কেল্লা, ফিরোজ শাহ কোটলা এবং চাদনী চক এক নিমেষেই নিয়ে যাবে প্রাচীন ভারতে। দিল্লি চিড়িয়াখানা থেকে নেওয়া যেতে পারে বিস্ময়কর সাদা বাঘের দর্শন।

ইন্ডিয়া গেট

নয়াদিল্লির রাজপথের পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটির আরও একটি নাম অল ইন্ডিয়া ওয়ার মেমোরিয়াল। ১৩৮ ফুট উচু ঐতিহাসিক কাঠামোটি নকশা করেছিলেন ব্রিটিশ স্থাপত্যশিল্পী স্যার এডউইন লুটিয়েন্স। শহরের এই যুদ্ধের স্মারকটিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়।

এটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তৃতীয় অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধের সময় মারা যাওয়া ৮৪ হাজার ভারতীয় এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের প্রতি। স্মৃতিস্তম্ভটির পৃষ্ঠে খোদাই করা আছে ১৩ হাজার ৩০০ জন সৈনিকের নাম। এই স্থাপনাটির পাশেই রয়েছে একটি মনোরম শিশু পার্ক।

কুতুব মিনার

বিজয় টাওয়ার নামে খ্যাত এই মিনারটি পুরো কুতুব কমপ্লেক্সের একটি অংশ, যেটি দিল্লির লাল কোটে অবস্থিত। ঘুরিদ রাজবংশের শাসক মুহম্মদের ডেপুটি কুতুব-উদ্দিন আইবেক ১১৯৯ সালে কুতুব মিনার নির্মাণ শুরু করেন। উপরের অংশগুলো সম্পন্ন করেন শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ ১১৯৯ এবং ১৫০৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে।

ইলতুৎমিশ ত্রয়োদশ শতকের সূফী সাধক ও পন্ডিত কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর ভক্ত ছিলেন। তাই তার নামেই মিনারের নামকরণ করা হয়। এটি ইসলামিক স্থাপত্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিম এশীয় নকশার অসামান্য মেলবন্ধনের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ১৯৯৩ সালে এটি বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়।

সম্রাট হুমায়ুনের সমাধি

সমাধিটি ১৫৫৮ সালে তৈরি করেছিলেন হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী মুঘল সম্রাজ্ঞী বেগা বেগম। এর নকশা করেছিলেন পারস্য স্থপতি মিরক মির্জা গিয়াস এবং তার পুত্র সাইয়্যিদ মুহাম্মদ।

পূর্ব নিজামুদ্দিন রোডে অবস্থিত এই সমাধি পুরো একটি সমাধি কমপ্লেক্সের অংশ, যেখানে শায়িত আছেন আরো অনেক মুঘল শাসক। এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম উদ্যান-সমাধি। এটিই ছিল প্রথম স্থাপনা, যেখানে বৃহৎ পরিসরে লাল বেলেপাথর ব্যবহার করা হয়েছিল।

এর পারস্য ঘরানার চারবাগ বাগান পরবর্তী মুঘল স্থাপত্যশৈলীতে এক দীর্ঘ মাইলফলক স্থাপন করেছিল, যা ভারতে এর আগে কখনো দেখা যায়নি।

লালকেল্লা

পুরাতন দিল্লির এই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি ব্যবহৃত হতো মুঘল সম্রাটদের প্রধান বাসস্থান হিসেবে। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৮ সালের ১২ মে এটি নির্মাণ করেন।

শুধু লাল নয়; এর সঙ্গে সাদা রঙও আছে। এর নকশা করেছেন স্থপতি ওস্তাদ আহমদ লাহোরি, যিনি তাজমহলও নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু লাহোরি গেটের উপরে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিন (ভারতের স্বাধীনতা দিবস) প্রধানমন্ত্রী দুর্গের প্রধান ফটকে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

যন্তর মন্তর

শব্দ দুটির অর্থ স্বর্গের সামঞ্জস্য পরিমাপের যন্ত্র। এটি ১৩টি স্থাপত্য জ্যোতির্বিদ্যা যন্ত্র নিয়ে গঠিত। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত এই স্থাপনাটির গোড়া পত্তন হয়েছিল ১৭২৪ সালে জয়পুরের মহারাজা দ্বিতীয় জয় সিং-এর মাধ্যমে। ক্যালেন্ডার এবং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সারণীতে চূড়ান্ত সংশোধন আনার জন্য তিনি পাঁচটি মানমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে এই নয়াদিল্লিরটি ছিল সর্বপ্রথম।

সম্রাট যন্ত্র, জয়প্রকাশ, রাম যন্ত্র এবং মিশ্র যন্ত্র; এই চারটি স্বতন্ত্র যন্ত্র নিয়ে গঠিত যন্তর মন্তর। মানমন্দিরটির উপর ১৭২৪ সালে বসানো ৭২৩ ফুট উচু একটি ফলক এখনো বহাল তবিয়তে আছে।

স্বামী নারায়ণ অক্ষরধাম

হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের সংগঠন বোচাসনবাসি অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থা বা বিএপিএস। সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট প্রমুখ স্বামী মহারাজ নির্মাণ করেছিলেন দিল্লির এই অক্ষরধাম। ভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এ পি জে আব্দুল কালাম, মনমোহন সিং, এল কে আদবানি এবং বি এল জোশীর উপস্থিতিতে ২০০৫-এর ৬ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয় মন্দিরটি।

কমপ্লেক্সটিতে একটি অভিষেক মণ্ডপ, সহজ আনন্দ জলের প্রদর্শনী, এবং একটি শৈল্পিক বাগান আছে। পাশাপাশি আছে সহজানন্দ দর্শন, নীলকান্ত দর্শন, এবং সংস্কৃতি দর্শন নামে তিনটি প্রদর্শনী।

২০০৭-এর ১৭ ডিসেম্বর অক্ষরধাম মন্দির কমপ্লেক্সটি বিশ্বের বৃহত্তম হিন্দু মন্দির হিসেবে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছিল। এটি ৩৫৬ ফুট লম্বা, ৩১৬ ফুট চওড়া এবং ১৪১ ফুট উচু।

জাতীয় জাদুঘর

১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শিল্পের আধুনিক যুগ পর্যন্ত নানা ধরনের নির্দশনের সংগ্রহশালা। জনপথে অবস্থিত জাদুঘরটি পরিচালিত হয় সরাসরি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। এখানে আছে প্রায় ২ লাখ শিল্পকর্ম, যা ৫,০০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।

শিল্পের প্রায় সকল শাখা নিঙড়ে আনা হয়েছে এই সংগ্রহগুলো। যেমন- পাথর, ব্রোঞ্জ, পোড়ামাটির ভাস্কর্য, অস্ত্র, বর্ম, অলঙ্কর, গয়না, পাণ্ডলিপি, ক্ষুদ্রাকৃতি এবং তাঞ্জোর চিত্রকর্ম, বস্ত্র, মুদ্রা, এপিগ্রাফি। তিনটি তলা বিশিষ্ট পুরো ভবনটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি শোভাবর্ধক উদ্যান।

সুন্দর নার্সারি

পূর্বে আজিম বাগ নামে পরিচিত হুমায়ুনের সমাধি সংলগ্ন এই পার্ক কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছিল ১৬ শতকে মুঘলদের হাতে। ৯০ একর জুড়ে বিস্তৃত এই দর্শনীয় স্থানটির অবস্থান গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে।

এখানকার ১৫টি স্মৃতিস্তম্ভের মধ্যে ৬টিই ইউনেস্কো স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সুন্দরওয়ালা বুর্জ, সুন্দরওয়ালা মহল এবং লাক্কারওয়ালা বুর্জ।

২০০৭ সালে সংস্কারের পর ২০১৮-এর ২১ ফেব্রুয়ারি নার্সারিটি পুনরায় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখন এতে ৩০০ টিরও বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে, যা এটিকে দিল্লির প্রথম বোট্যানিক্যাল গার্ডেনের মর্যাদা দিয়েছে।

অমৃত উদ্যান

রাষ্ট্রপতি ভবনের ঠিক পেছনেই অবস্থিত বাগানটিকে এমন নাম দেওয়া হয়েছে। মুঘল এবং ইংরেজ ঘরানার শিল্পকে একত্রিত করা এই উদ্যানের পূর্ব নাম ছিল মুঘল বাগান। এটি প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

সমকোণে ছেদ করা দুটি সরু জলাশয় এই বাগানটিকে একটি বর্গাকার গ্রিডে বিভক্ত করেছে। এটি মুলত পারস্য ও ইন্দো-পারস্য ধরনের নকশা, যাকে চারবাগ বলা হয়। এই জলাশয়গুলোর সংযোগগুলোতে ছয়টি পদ্ম আকৃতির ফোয়ারা রয়েছে, যা ১২ ফুট উচ্চতায় উঠে যায়। বন্য পাখিদের খাওয়ানোর জন্য রয়েছে পাখির টেবিল।