সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে বিহারিদের হাতে জবাই হন বাবা

সন্তানের জন্য বাবার অপরিমেয় ভালোবাসা এবং হাসিমুখে অসম্ভব সব ত্যাগ স্বীকারের কত ঘটনাই তো পড়েছি আমরা! কিন্তু অকল্পনীয় পিতৃস্নেহে সন্তানকে বাঁচাতে জল্লাদের শাণিত চাপাতি উপেক্ষা করে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ছুটে যাওয়ার কয়টা ঘটনা জানি আমরা? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে কলোনিতে ঘটেছিল এমন এক ঘটনা। পুত্র গাজী কামাল উদ্দিন কামরানকে বাঁচাতে পিতা আলী করিম ছুটে এসেছিলেন উন্মত্ত বিহারিদের উদ্যত চাপাতির নিচে!

চট্টগ্রামের খুলশী থানার অন্তর্গত পাহাড়তলী মৌজার শহীদ লেন (পাঞ্জাবী লেন), মাস্টার লেন, গোয়ানিজ কোয়ার্টার, সরাইপাড়া, ওয়্যারলেস, ঝাউতলা, শেরশাহ কলোনী, ফিরোজশাহ কলোনী ইত্যাদি এলাকার বেশিরভাগ অধিবাসী ছিলেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এদের মধ্যে বাঙালিরা সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য হলেও বিপুলসংখ্যক অবাঙালি বিহারিও ছিল। বহু বছর ধরেই বিহারি অবাঙালিদের সঙ্গে বাঙালিদের সদ্ভাব-সম্প্রীতি বজায় থাকলেও ধীরে ধীরে বিহারিদের নির্দয় কদর্য রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করে। একাত্তরের শুরু থেকেই যা মোড় নেয় উগ্র ভয়ঙ্কর রূপে। কিন্তু তখনো সম্ভবত কেউ কল্পনাও করতে পারেনি পরের নয়টি মাসজুড়ে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর কী ভয়াবহ পৈশাচিক গণহত্যা চালাতে যাচ্ছে বিহারিরা।

১০ নভেম্বর, ১৯৭১। ২০ রমজান, বুধবার। সেদিন খুব ভোরে পাঞ্জাবী লেন থেকে কয়েকজন মুসল্লি বের হয়ে এসেছেন মসজিদে নামাজে যাবেন বলে। নামাজ শেষে সবাই যখন বাসায় ফিরছিলেন, তখন হঠাৎ পথেই দেখা হলো স্থানীয় এক অবাঙালির সঙ্গে। সে অভিযোগ করলো, মসজিদের পুর্বদিকে পাহাড়ের কিনারে সমতল জায়গায় চারজন বিহারিকে বাঙালিরা মেরে ফেলেছে। সেই অবাঙালি চিন্তিত স্বরে বললো, “কলোনিকা হাল খারাব হো যায়েগি”। সে এই চার মুসল্লিকে পাহাড়ের কিনারে গিয়ে লাশ চারটা দেখে আসার জন্য বলল, কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য এগিয়ে যান মুসল্লিরা।

মুসল্লিদের মধ্যে ছিল এ কে এম আফছার উদ্দিন, আকবর হোসেন, আবদুল গফুর ইয়াজদানি, মো. মোতাহেরুর রহমান ও মসজিদের মুয়াজ্জিন। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী রাস্তা পার হয়ে তারা যখন খোলা জায়গায় গেলেন, সেখানে অগণিত অবাঙালি নানা রকমের মারণাস্ত্র নিয়ে লাশগুলোর আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে এবং অসংখ্য বিহারি পূর্বদিক থেকে প্রচণ্ড শোরগোল করতে করতে এদিকে আগ্রসর হচ্ছে। 

তারা চিৎকার করে বলছে, “খাতাম কার দো, খাতাম কার দো!” এরইমধ্যে পাহাড়তলী লোকোশেডের বয়লার মেকার আকবর চিৎকার করে ফাঁদে পা দেওয়া এই পাঁচ মুসল্লিকে বলল, ‘‘ইহাছে ভাগো সালে বাঙ্গা্লি লোগ’’! সাথে সাথে পাশ থেকে সমস্বরে বিহারিরা চিৎকার করে ওঠে, ‘‘ভাগনে মাত দো ইছ সালে লোগকো, খাতাম কারো!’’ 

ঠিক এমন এক অবস্থায় যখন বিহারিরা রীতিমতো জোটবদ্ধ হয়ে বাঙালি নিধনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং পাহাড়তলী পুলিশ ফাঁড়ি কিংবা ডবলমুরিং থানায় আকুতি জানিয়েও তাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের বাসা থেকে আবদুল গোফরান, আবদুল মান্নান ও সালেহ সাহেবের ছোট ভাই গাজী কামাল উদ্দিনকে ধরে পাহাড়তলী গার্লস স্কুলের মাঠে জড়ো করে ঘাতকদল। 

বাবা আলী করিম চট্টগ্রাম রেলওয়ে কলোনিতে চাকরি করতেন। বড় সন্তান গাজী মেছবাহ উদ্দিন পশ্চিম পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীতে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে লাহোরে কর্মরত ছিলেন। আরেক সন্তান গাজী সালেহ উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেছবাহ পাকিস্তান থেকে পালিয়ে চলে আসেন এবং বিএলএফে দ্বিতীয় ব্যাচে যোগ দিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তার সাথে যোগ দেন গাজী সালেহসহ আরও একজন অর্থাৎ আলী করিমের তিনজন সন্তান। বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরার জন্য আলী করিম বৃদ্ধ বয়সে আবার চাকরিতে ফেরেন একাত্তরের জুনে। সাথে নিয়ে এসেছিলেন ছোট ছেলে গাজী কামাল উদ্দিন কামরানকে। ক্লাস ফোর পড়ুয়া কামরানকে আলী করিম নিজের কাছে রেখেছিলেন কারণ তিন ছেলেকে আর কখনো দেখতে পান কি-না নিশ্চিত নন। 

কিন্তু এটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ যেকোনো সময়ে আলী করিম, তার ছোট ভাই আলী হোসেন এবং সন্তান গাজী কামালের বিপদ হতে পারে। তাদের পাঞ্জাবী লেনের বাড়ির দুইদিকেই ছিল বিহারিদের বাস। যেসব বাঙালি চাকরিতে ফিরে এসেছে, তাদের সন্তান বা ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে কি-না সে ব্যাপারে খোঁজখবর করছিল বিহারি, রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। অন্যান্য দিনের মতোই ১০ নভেম্বর ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে কর্মস্থলে গেলেন আলী। রোজা রেখেছিলেন তিনি সেদিন, অফিসে যেতেন পাঞ্জাবী লেন থেকে পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট, ঢাকা ট্রাঙ্ক রোড হয়ে ঘোরাপথে সিআরবিতে। 

সেদিন অফিসে গিয়েও কিছুক্ষণ পরেই আলী করিম বাসায় ফিরে এলেন। তার ছোট ভাই আলী হোসেন, ছেলে গাজী কামালকে জানান, ‘‘বিহারীরা দলবদ্ধভাবে পাঞ্জাবী লেনের দিকে এগিয়ে আসছে, তাদের হাতে বন্দুক, তলোয়ার, লাঠিসহ নানা ধরনের অস্ত্র আছে। তোরা সবাই সিডিএ মার্কেটের দিকে চলে আয়।’’ বলেই আলী করিম আবার অফিসের দিকে রওনা হন। কারণ তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিল বিহারি অফিসার, যে পান থেকে চুন খসলেই চরম দুর্ব্যবহার করত। কামাল ও তার চাচা আলী করিমের সাথেই বেরিয়ে বাকিদের খোঁজ নিচ্ছিলেন, তখন দেখা হয় জনৈক নুরুন্নবীর সাথে।

তিনি তাদের ঘরে চলে যেতে বললে তারা ঘরে চলে যান। তখন সেখান এসে হাজির হন মান্নান ও গোফরান নামে দুই প্রতিবেশী। তারা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন একসাথে বেরিয়ে যাবার, কিন্তু কাকা আলী হোসেন বিহারিদের ভয়ে বেরোতে চাচ্ছিলেন না, বলছিলেন ‘‘আমরা তো কারো কোন ক্ষতি করি নাই, আমাদের কেন কিছু করবে?’’ 

কিন্তু আলী হোসেনের কথা সত্য হলো না। ৭টার দিকে বিহারিরা আলী করিমের বাসা ঘিরে ফেলল, প্রথমেই তারা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া তিন ভাইয়ের খোঁজ করতে থাকল। তাদের না পেয়ে আলী হোসেন, গাজী কামাল, প্রতিবেশী গোফরান ও মান্নানকে ধরে নিয়ে গেল। বিহারিদের আসতে দেখেই গাজী কামাল তাদের বাড়ির এক ড্রামের ভেতর লুকিয়েছিল। তাকে সেখান থেকে টেনে বের করল বিহারিরা, তাকেও বাকিদের সাথে নিয়ে যাওয়া হলো পাহাড়তলী গার্লস স্কুলের মাঠে। বলা হলো, পাহাড়ের ওপারে (বর্তমানে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালের সামনে) চারটা লাশ পড়ে আছে। থানা থেকে ওসি সাহেব এসেছেন শনাক্ত করার জন্য। সবাইকে ডাকছেন। 

বিহারিদের আচরণে কাকা আলী হোসেন বুঝতে পারলেন তাদের মেরে ফেলা হবে। তিনি ছোটজন কামরানকে বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে এরা আমাদের মেরে ফেলবে। তুই ছোট আছিস, কোনো ফাঁকে পালিয়ে যা।’’ 

তার কথা শুনে সাথে সাথে লাইন থেকে বের হয়ে পেছন দিকে দৌড় দিল গাজী কামাল। বিহারিরাও তার পেছনে দৌড়াতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে ওদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গাজী কামাল সোনা মিয়া ড্রাইভারের বাসায় টয়লেটের সেপটিক ট্যাংকের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বিহারিরা আর তাকে না পেয়ে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর গায়ে পায়খানামাখা অবস্থায় বেরিয়ে হক সাহেবের বাসায় ঢুকে গোসল করে গাজী কামাল। হক সাহেবকে বিহারিরা সমীহ করত, তিনি গাজী কামালকে স্টোররুমে ঢুকিয়ে তালা মেরে রাখেন। 
আড়াইটার সময় যখন তিনি তালা খুলে জানান বিহারীরা চলে গেছে, সবার প্রথমে যে প্রশ্নটা গাজী কামালের মাথায় আসে সেটা হচ্ছে, তার বাবা আলী করিম কোথায়?

আলী করিম ইতোমধ্যে অফিসে বসেই খবর পেয়েছিলেন যে বাঙালিদের ফয়'স লেকের পাহাড়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর কেউ ফিরে আসছে না। সকালেই বাসার সবাইকে সাবধান করে অফিসে এসেছেন আলী করিম, কিন্তু এবার আর তার মন বাঁধ মানলো না। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি। অফিসের বারান্দায় পায়চারী করতে করতে ছটফট করছিলেন, কিন্তু উচ্চপদস্থ বিহারি কর্মকর্তা তো ছুটি দেবে না। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন আলী করিম। 

চাকরির পরোয়া না করে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বেরিয়ে এলেন তিনি। প্রথম থানায় গেলেন, কিন্তু কোনো সহযোগিতা পেলেন না। সেখান থেকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান নবী চৌধুরীর বাড়িতে গেলেন। সেও তাকে সান্ত্বনা দিল। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে জানাল। কিন্তু কিছুই করল না। 

দুপুর ১টার দিকে পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেটের ওপর দিয়ে রেললাইন পর্যন্ত এলেন। প্রচুর বাঙালি পালাচ্ছে তখনো, কেউ কলোনি থেকে পালিয়ে এসেছে, কেউ আশপাশ থেকে। সন্তান গাজী কামাল কিংবা ভাই আলী হোসেন কাউকেই খুঁজে পেলেন না তিনি। প্রচণ্ড অস্থির হয়ে চলে এলেন কলোনির মুখে। তখনো ভেতরে বিহারি, আধা সামরিক মিলিশিয়া এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা চাপাতি, কুড়াল, দাসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বাঙালিদের কচুকাটা করছে। সবাই তাদের কলোনির ভেতর ঢুকতে নিষেধ করল। কিন্তু সন্তান-প্রিয়জনদের খোঁজ পেতে, তাদের প্রাণে বাঁচাতে মরিয়া আলী করিম দুই প্রতিবেশী মো. আলী এবং নাদেরুজ্জামানকে নিয়ে কলোনির মধ্যে ঢুকে পড়েন। তখন বাজে বেলা দেড়টা।

বাসার কাছাকাছি আসার আগেই আলী করিম ও মো. আলীকে ধরে ফেলে বিহারীরা, তাদের সাথে আরও ৮-১০ জনকে ধরে এনে পাহাড়ের গোড়ায় জড়ো করে। ততক্ষণে গণহত্যা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শুরুতেই তাদের মারে না বিহারি জল্লাদেরা। তাদের দিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল একটা গর্ত খোঁড়ানো হয়। এরপরে তাদের নৃশংসভাবে জবাই করে বিহারীরা। তার ছেলে মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দিন তার সাক্ষাৎকারে সন্তানকে বাঁচাতে বাবার লাশ খুঁজে পাবার মুহূর্তটা জানিয়েছেন এভাবে-

‘‘বাবার লাশ দেখতে গেলাম (বর্তমান টিভি অফিসের সম্মুখে)। ওপরে সাদা হাফশার্ট দিয়ে পিছ মোড়া করে হাত বাঁধা। ছুরি চালিয়ে জবাই করেছে। গরু যেভাবে কোরবানিতে জবাই করে। পেটটা আড়াআড়িভাবে ফাঁড়া। ভারি চশমাটা পাশে পড়ে আছে। জিহ্বা বের হয়ে আছে। খোলা চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, যেন তার রক্তাক্ত চেহারায় নিষ্পাপ চাহনিতে একটা স্বাধীন নিরাপদ ভূখণ্ডের আকুল প্রত্যাশা!’’

তথ্যসূত্র:

- সাক্ষাৎকার, গাজী সালেহ উদ্দিন, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

- পাহাড়তলী গণহত্যা/চৌধুরী শহীদ কাদের, ১৯৭১ গণহত্যা ও নির্যাতন, আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট