স্বয়ংক্রিয় যানের চাহিদা কেন বাড়ছে?

স্বয়ংক্রিয় যানের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি বাজারে আনার উপযুক্ত হয়নি৷ জার্মানির দুটি কোম্পানি “টেলি-ড্রাইভিং” চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

চালক ছাড়াই চলছে গাড়ি। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল ভুতুড়ে কাহিনী। সিনেমার কল্প-কাহিনী মনে করা হতো এমন দৃশ্যকে। তবে বাস্তবেই সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। আর অতি শিগগিরই সড়কের দখল নেবে এমন যান। জার্মানির দুটি স্টার্টআপ কোম্পানি সেই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।

এরমধ্যে মিউনিখের “ফ্যার্নরাইড” কোম্পানি লজিস্টিক্স ক্ষেত্রের ট্রাকের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে। আর দেশটির রাজধানী বার্লিনের “ভাই” কোম্পানি ব্যক্তিগত গাড়িতে এই প্রযুক্তি প্রয়োগে মনোনিবেশ করেছে।

টোমাস ফন ডেয়ার ওয়ে ‘ভাই' কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন৷ তিনি এর আগে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “স্বচালিত ট্যাক্সি” তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন টোমাস ফন ডেয়ার ওয়ে। তিনি “ভাই” কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা।

ফন ডেয়ার ওয়ে মনে করেন, “অটোনোমাস ড্রাইভিংয়ের ক্ষেত্রে এটা এমন এক ভিন্ন কনসেপ্ট, যা অনেক দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব। এভাবে সমাজে এই প্রযুক্তি সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা ভাঙা যাবে। অটোনোমাস প্রযুক্তি কোনো এক সময় কাজ করবে, সেই আশায় বসে থাকতে হবে না।”

আলিনা প্রেস্তি অন্যতম প্রথম “টেলি-চালক”৷ তিনি অফিস থেকেই একটি গাড়ি চালাচ্ছেন। মনে হয় তিনি যেন চালকের আসনে বসে আছেন৷ গাড়িতে লাগানো ক্যামেরার দৌলতে ৩৬০ ডিগ্রি, অর্থাৎ চারদিক দেখা যাচ্ছে৷ ওয়্যারলেস যোগাযোগের মাধ্যমে যান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যানটি একাধিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একটি কাজ না করলেও ক্ষতি নেই৷ জরুরি অবস্থায় প্রেস্তি একটি বোতাম টিপে যানটিকে থামাতে পারেন।

তিনি বলেন, “টেলি-ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতা আসল গাড়ি চালানোর মতো। আমি পুরোপুরি সজাগ রয়েছি৷ গাড়িতে মাইক্রোফোন বসানো রয়েছে৷ এ্যাম্বুলেন্স, পুলিশের গাড়ি বা যেকোনো শব্দ আমি আমার হেডফোনে শুনতে পাই।”

“ফ্যার্নরাইড” তাদের ট্রাকের ক্ষেত্রে “টেলি-চালকের” চেষ্টা চালাচ্ছে৷ জার্মানির এস্টোনিয়ার মুগা বন্দরে এমন পরীক্ষা চলছে৷ প্রায় ৮০% সময়ে ট্রাক আপনা-আপনি চলতে পারছে। শুধু মাল তোলা ও খালাস করার সময়ে “টেলি-চালক হাল ধরছেন। এভাবে একজন চালক একইসঙ্গে চারটি ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ২৪টি ট্রাক একজন চালককে দিয়ে চালানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে কোম্পানিটির৷

শেংকার ও ফলক্সভাগেন কোম্পানিও নিজেদের সাইটে “ফ্যার্নরাইড” কোম্পানির কয়েকটি ট্রাক কাজে লাগাচ্ছে৷

হেন্ড্রিক ক্রামার “ফ্যার্নরাইড” কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জার্মানিতে ট্রাক চালকের অভাবের কারণে তার প্রযুক্তি লজিস্টিক্স কোম্পানিগুলোর কাছে বিশেষ কদর পাচ্ছে৷

ক্রামার মনে করেন, “শিল্পক্ষেত্র বিশাল চাপের মুখে পড়েছে৷ ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই ট্রাক কাজে লাগাতে পেরে গ্রাহকরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ৷ তবে তারা যত দ্রুত সম্ভব বড় আকারে এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে চান৷ সেই চাহিদার সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে সরবরাহ করতে পারছি না৷ গ্রাহকদের আগ্রহ আমাদের সরবরাহের ক্ষমতার তুলনায় বেশি।”

“ফ্যার্নরাইড” কোম্পানির চালকের অভাব নেই। ইয়োসেফ মানকা প্রথম ৪০ জন টেলি-ট্রাক চালকদের একজন৷ পিঠের ব্যথার কারণে তিনি ট্রাক ড্রাইভারের কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। রাজপথে বাম্পের ধাক্কা তাকে কষ্ট দিয়েছে৷ এখন তার জীবন অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।

ইয়োসেফ মানকা বলেন, “ট্রাক চালক হিসেবে আমাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের থেকে দূরে একা থাকতে হতো৷ ফলে সবারই কষ্ট হতো৷ আর এখন আমি নিজের ইচ্ছামতো সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে পারি৷ শনিবার কোথাও ট্রাক পরিষ্কারের মতো কাজ করতে হয় না৷ আগে শনিবার বাসায় ফিরতে পারতাম না। এখন সময়মতো অফিস থেকে বাসায় ফিরি।”

“ফ্যার্নরাইড” কোম্পানি ভবিষ্যতে হাইওয়ের উপরেও ট্রাক চালাতে চায়৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজপথে টেলি-ড্রাইভিং কতটা নিরাপদ হবে?

হাইওয়েতে ‘টেলি-ড্রাইভিং’ কতটা নিরাপদ

দুর্ঘটনা গবেষক হিসেবে সিগফ্রিড ব্রকমান সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন৷ তার মতে, “শহরের সড়কে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল৷ সেখানে ৩৬০ ডিগ্রি নজর রাখতে হয়৷ কেউ কম্পিউটারে বসে সত্যি সেটা করতে পারেন কিনা এবং সব সময়ে সজাগ থাকতে পারেন কিনা, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত নই। আউটোবানে সেই কাজ অনেক সহজ, কারণ সেখানকার পরিবহন কাঠামো ততটা জটিল নয়৷”

“ভাই” কোম্পানি এখনো জার্মান কর্তৃপক্ষের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে। সেটা নিশ্চিত নয় বলে কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস শহরে একটি শাখা খুলেছে। প্রয়োজনে সেখানেই কাজ শুরু করা যেতে পারে৷ কিন্তু ফন ডেয়ার ওয়ে ঠিক সেটাই চান না। ইউরোপকেই টেলি-ড্রাইভিংয়ের পথিকৃৎ করে তোলাই তার স্বপ্ন।