নিরক্ষরেখার অনেক উপরে, উত্তর গোলার্ধের শেষ প্রান্তে অবস্থিত উত্তর মেরুর গা ঘেঁষে চলে গেছে একটি সড়ক। একে বলা হয় পৃথিবীর শেষ রাস্তা, যার পোশাকি নাম ই-৬৯ হাইওয়ে। ইউরোপের দেশ নরওয়েতে অবস্থিত এই রাস্তাটি নিয়ে বিশ্ববাসীর কৌতুহলের শেষ নেই। বিশেষ করে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এই রাস্তায় অন্তত একবার পা রাখা জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন। তবে রোমাঞ্চকর এই স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হলেও, সেখানে একা যাওয়ার ওপর রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
আন্তর্জাতিক মহলে পৃথিবীর শেষ রাস্তা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ই-৬৯ হাইওয়ে উত্তর ইউরোপের নর্ডক্যাপের সঙ্গে নরওয়ের ওল্ডারফিউওর্ড গ্রামকে সংযুক্ত করেছে। প্রায় ১২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অনন্য পথটিতে রয়েছে পাঁচটি বিশেষ টানেল বা সুড়ঙ্গ। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সুড়ঙ্গটির নাম নর্থ কেপ টানেল, যার দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ৯ কিলোমিটার। বিস্ময়কর এই সুড়ঙ্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২১২ মিটার গভীরে গিয়ে শেষ হয়েছে। এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় একদিকে দিগন্তজোড়া সমুদ্র আর অন্যদিকে মাইলের পর মাইল জমে থাকা বরফের চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করে।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সড়কের পর আর কোনো মানুষের তৈরি রাস্তা নেই। এখান থেকে কেবল বরফে ঢাকা সুমেরু মহাসাগর আর উত্তর মেরুর সীমানা শুরু হয়েছে। ১৯৩০ সালের দিকে এই রাস্তা তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয় এবং ১৯৩৪ সালে পর্যটন ও মৎস্যচাষের কথা মাথায় রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকের কাজ শেষে ১৯৯২ সালে এই মহাসড়কের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
ই-৬৯ হাইওয়ের অভিনব ও চরম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে কাউকে একা যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। এর প্রধান কারণগুলো হলো: এখানকার আবহাওয়া অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় যেকোনো মুহূর্তে আবহাওয়া মারাত্মক রূপ নিতে পারে। এমনকি তীব্র গ্রীষ্মকালেও এখানে হঠাৎ বরফ পড়া শুরু হয়। এই রাস্তায় যেকোনো সময় প্রচণ্ড গতিতে হিমশীতল বাতাস ও ঝড় শুরু হতে পারে, যা মানুষের পক্ষে একাকী মোকাবিলা করা অসম্ভব। অতিরিক্ত তুষারপাত এবং বৃষ্টির কারণে শীতকালে এই রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। পিচ্ছিল রাস্তায় গাড়ি চালানো জীবন সংশয়ের কারণ হতে পারে।
এই অপ্রত্যাশিত এবং বিপজ্জনক প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণেই এই রাস্তায় ভ্রমণের জন্য বিশেষ নিয়মকানুন মেনে দলবদ্ধভাবে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে এমন আরও কিছু রাস্তা থাকলেও, উত্তর মেরুজ্যোতি দেখার সুযোগ এবং চরম অ্যাডভেঞ্চারের কারণে ই-৬৯ হাইওয়ে বিশ্ববাসীর কাছে সবসময়ই এক রহস্যময় আকর্ষণ।



