নিরাপদ ব্রয়লার মুরগি সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন?

বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিনের প্রায় ৩৭% পূরণ হয় মুরগির মাংস থেকে। একসময় শুধু বাড়ির উঠানে সীমাবদ্ধ থাকলেও এই গৃহপালিত পাখি পালন এখন মাংস ও ডিম উৎপাদনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সার্বিক উৎপাদন পদ্ধতিতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। সম্প্রতি শুরু হয়েছে নিরাপদ উপায়ে ব্রয়লার মুরগি পালন কার্যক্রম। চলুন জেনে নিই স্বাস্থ্য রক্ষায় ও পুষ্টি লাভে নিরাপদ ব্রয়লারের ভূমিকা সম্পর্কে।

নিরাপদ ব্রয়লার মুরগি কী

অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত ব্রয়লার মাংস উৎপাদন বিশ্বব্যাপী ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর সেই সূত্রেই বাংলাদেশেও নিরাপদ ব্রয়লার মুরগি নিয়ে গবেষণা চলছে।

পশু-পাখির স্বাস্থ্য রক্ষা, ভালো পরিবেশ এবং পণ্যের গুণগত মানকে কেন্দ্র করে নিরাপদ উপায়ে ব্রয়লার মুরগি পালন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় পশু-পাখির সঠিক বৃদ্ধি এবং কৃষকদের লাভের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই পদ্ধতিতে পশু-পাখির খাবারগুলোতে ভেষজ সম্পূরক মানসহ জৈব-সুরক্ষিত ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়। শুধু তাই নয়, পুরো পালন প্রক্রিয়াকে অ্যান্টিবায়োটিক ও বৃদ্ধি হরমোনসহ সব ধরনের বিপজ্জনক উপাদানমুক্ত রাখা হয়। এই পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতিতে পালন করা মুরগিগুলোকেই মূলত নিরাপদ ব্রয়লার হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

নিরাপদ ব্রয়লার পোল্ট্রিতে সফলতা

বিকল্প ব্রয়লার উৎপাদনে সম্প্রতি যুগান্তকারী সাফল্য পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম এবং তার সহযোগী মো. আবু রায়হান পারভেজ। তারা তাদের গবেষণাগারে উদ্ভিদের নির্যাস থেকে কোনো অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়া ছাড়াই ব্রয়লার খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম হন।

ব্রয়লার খাদ্যে তারা মূলত বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করেছিলেন। তারা খেয়াল করেন, এগুলো অ্যান্টিবায়োটিকের চেয়েও ভালো কাজ দিচ্ছে। উৎপাদিত মুরগিগুলো তুলনামূলকভাবে উচ্চ ওজন সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং এই ওজনও বেশ দ্রুত বাড়ছে। এমনকি এগুলোর মধ্যে রোগাক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর হার ছিল অনেক কম।

দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলছে এই গবেষণা কার্যক্রম। এটি বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে উন্নত পোল্ট্রি শিল্পের অভিমুখে এক বিশাল পদক্ষেপ হবে।

এছাড়া বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে নতুন উপায়ে ব্রয়লার চাষের অগ্রগতি নিয়ে ২০২৩ সালে ৮ সেপ্টেম্বর জরিপভিত্তিক একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। কীভাবে চাষ হচ্ছে, চাষিরা আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হতে পারবেন এবং এ নিয়ে ভোক্তারাই বা কী ভাবছেন- এ বিষয়গুলো সবিস্তারে উঠে আসে গবেষণায়।

এটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থা (বিএআরআই), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইউ), এবং জাপানের রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যানিটি অ্যান্ড ন্যাচারের (আরআইএইচএন) মাধ্যমে।

এতে বিএআরআইয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন শানাজ আক্তার, বিএইউ থেকে ছিলেন মো. তাজ উদ্দিন এবং আরআইএইচএনের পক্ষে ছিলেন অরূপ রতন ধর।

গবেষণায় দেখা যায়, নতুন ব্রয়লার চাষ পুরনো ব্রয়লার চাষের তুলনায় বেশি লাভজনক। কারণ হিসেবে দেখা গেছে নতুন ব্রয়লার পোল্ট্রির মৃত্যুহার প্রচলিত ব্রয়লারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল, ফলে উৎপাদন খরচ কম। নতুন ব্রয়লার চাষে অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার না করে পোল্ট্রিগুলোকে অরগানিকভাবে পালন করা হয়েছে। ফলে মাংসের মান উন্নত হয়েছে এবং নিরাপদ মাংস ভোক্তারা নির্দ্বিধায় কিনেছেন।

এই পরিস্থিতি আগের তুলনায় ব্রয়লার মাংসকে উচ্চ বাজার মূল্যের দিকে ধাবিত করছে।

নিরাপদ ব্রয়লার মুরগি কেন খাবেন?

এখানে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াটিই এমন যে একদম ঝুঁকিমুক্তভাবে পরিণত করে তোলা হয় মুরগিগুলোকে। এখানে নেই কোনো রকম ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ এবং বৃদ্ধি হরমোনের মতো কোনো রাসায়নিক উপাদানের ব্যবহার। ফলে ভয় থাকছে না কোনো ধরনের সংক্রমণ ও মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার। এমনকি এই মাংস প্রচলিত ব্রয়লারের থেকেও ভালো স্বাদযুক্ত এবং অধিক পুষ্টিকর।

নিরাপদ ব্রয়লার মুরগির বাজার দর

এই পালন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত খাবার ও ওষুধগুলোর বেশিরভাগই স্থানীয় বাজারে পাওয়া দুষ্কর। রাসায়নিক বৃদ্ধির হরমোন ব্যবহার না করায় লালন-পালনের সময়কালও দীর্ঘ হয়। তাই এই মুরগি উৎপাদনের খরচ হবে আগের তুলনায় বেশি। ফলশ্রুতিতে, আগের ব্রয়লারের তুলনায় এই নতুন ধরনের ব্রয়লারের জন্য ভোক্তাদের বেশি টাকা খরচ করতে হবে।

দারাজ, ফিশমার্ট, অথবা, শপবিডি, ডেইলি ফুড শপ, ও বুনন বাস্কেটের মতো ই-কমার্স শপগুলোতে এই মুরগিগুলোর দর কেজি প্রতি ৩৫০ থেকে ৪৭৫ টাকা।