ঘুরে আসুন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত দিনাজপুরের রামসাগর দীঘি

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর সঙ্গে মিশে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমণ্ডিত এই ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেশ-বিদেশি পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য। একদিকে যেমন ভ্রমণের ক্ষুধা মিটে, অন্যদিকে পুরাতন সভ্যতার অবশিষ্টাংশের সান্নিধ্য দেয় অভূতপূর্ব রোমাঞ্চকর অনুভূতি। এমনি রেশ থেকে অভিজ্ঞতার সঞ্চার করতে পারে দিনাজপুরের রামসাগর ভ্রমণ। বিংশ শতাব্দীর শেষ সময়ে গড়ে তোলা এই দর্শনীয় স্থানটি স্থানীয়সহ দেশজুড়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।

চলুন, স্থানটির বিশেষ আকর্ষণ, যাওয়ার উপায় ও আনুষঙ্গিক খরচসহ যাবতীয় ভ্রমণ বৃত্তান্ত জেনে নেওয়া যাক।

রামসাগর দীঘির বিশেষত্ব

দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগ রংপুরের দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত আউলিয়াপুর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে রামসাগরের অবস্থান। দিনাজপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখা মিলবে এই দীঘিটির।

রামসাগর বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দীঘি, তটভূমিসহ যার দৈর্ঘ্য ১,০৩১ মিটার, প্রস্থ ৩৬৪ মিটার এবং আয়তন ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার। দীঘিটি গড়ে প্রায় ১০ মিটার গভীর। এর পাড় ১৩.৫ মিটার উঁচু।

অনেক আগে দীঘির পশ্চিম পাড়ের মাঝখানে একটি ঘাট ছিল, যেটি বানানো হয়েছিল বিভিন্ন আকৃতির বেলেপাথরের স্ল্যাব দিয়ে। ঘাটটি ছিল ৪৫.৮ মিটার দীর্ঘ ও প্রস্থে ১৮.৩ মিটার প্রশস্ত। প্রতিটি পাড় ছিল ১০.৭৫ মিটার উঁচু। এই পাড়ের কিছু অবশিষ্টাংশ এখনও দৃশ্যমান রয়েছে।

গুগল ম্যাপ থেকে নেওয়া

রামসাগর দীঘির নামকরণের ইতিহাস

পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে খনন করা হয় রামসাগর দীঘি। সে সময়ে দিনাজপুরের এই অঞ্চলটির রাজা ছিলেন রামনাথ আলীবর্দি খান। তার নামানুসারেই দীঘিটি রামসাগর নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। দীঘিটি খননে কাজ করেছিল ১৫ লাখ শ্রমিক এবং খরচ হয়েছিল তৎকালীন সময়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা।

এই দীঘির নামকরণ নিয়ে নানা ধরনের লোককথা প্রচলিত রয়েছে। ১৭৫০ সালে এক প্রচণ্ড খরায় রাজ্য জুড়ে ভয়াবহ পানির অভাব দেখা দেয়। এ সময় রাজ্যের রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নযোগে পুকুর খননের নির্দেশ পান। পানি সমস্যার এমন সমাধানের উপায় পেয়ে মাত্র ১৫ দিনে তিনি একটি পুকুর খনন করে ফেলেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে খনন করা জায়গা থেকে কোনো পানি উঠছিল না। এতে করে রাজ্যে চরম হতাশা নেমে আসে। কিছুদিন বাদে রাজা আবার স্বপ্নাদেশে নতুন বার্তা পেলেন। আর সেটি ছিল যে, দীঘি পানিতে ভরে যাবে যদি তার একমাত্র ছেলেকে বলি দেওয়া হয়।

অতঃপর রাজার নির্দেশে দীঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির তৈরি করা হয়। তারপর একদিন ভোরবেলা রাজার ছেলে যুবরাজ রামনাথ সাদা পোশাক পরে হাতির পিঠে চড়ে সেই দীঘির উদ্দেশে যাত্রা করেন। দীঘির পাড়ে পৌঁছানোর পর যুবরাজ হাতি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যান সেই মন্দিরে। আর সঙ্গে সঙ্গে দীঘির নিচ থেকে অঝোর ধারায় পানি বেরুতে থাকে। সবার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে নিমেষেই যুবরাজ রামনাথসহ কানায় কানায় পানিতে ভরে যায় বিশাল দীঘি। সেই সঙ্গে রচিত হয় রাজপুত্র রামনাথের জীবন্ত জলজ সমাধি।

আরেকটি লোককথায় শোনা যায় যে, রাজা আসলে স্বপ্নে স্পষ্টভাবে নিজের ছেলেকে বলি দেওয়ার বার্তা পাননি। বার্তাটি ছিল- দিঘিতে পানি পেতে হলে কারও প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে। তখন রাম নামের স্থানীয় এক যুবক স্বেচ্ছায় দিঘিতে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেয়। পরবর্তীতে রাজা এই আত্মত্যাগী তরুণের নামে দীঘিটির নাম রাখেন “রামসাগর”।

১৯৬০ সালে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আসে রামসাগর দীঘি। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ সালে এই দিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয় সবুজ ছায়াঘেরা উদ্যান, যা স্থানটিকে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এই রামসাগর উদ্যান জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষিত হয়।

রামসাগর বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দীঘি/সংগৃহীত

ঢাকা থেকে দিনাজপুরের রামসাগর যাওয়ার উপায়

রামসাগর ঘুরে দেখার জন্য প্রথমে ঢাকা থেকে দিনাজপুর যেতে হবে। বাসে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার গাবতলী, টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলেজগেট ও উত্তরা থেকে সরাসরি দিনাজপুরগামী বাস পাওয়া যায়। আধঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা পর পর দিনাজপুরের উদ্দেশে রওনা হয় গাড়িগুলো। এসি বা নন-এসি কোচভেদে বাস ভাড়া ৯০০ থেকে ১,৫০০ টাকা হয়ে থাকে।

যারা ট্রেন যাত্রা করতে ইচ্ছুক, তাদের ঢাকার কমলাপুর থেকে সকাল ১০টা ১৫ মিনিট, রাত ৮টা ও সাড়ে ১১টার দিনাজপুরগামী ট্রেনগুলোতে উঠতে হবে। শ্রেণিভেদে ট্রেনগুলোতে টিকেট মূল্য হতে পারে ৫৭৫ থেকে ১,৯৭৮ টাকা পর্যন্ত।

আকাশপথে যেতে হলে সৈয়দপুরগামী বিমানে উঠতে হবে। বিমানযোগে ঢাকা থেকে সৈয়দপুর যেতে সময় লাগে সর্বোচ্চ প্রায় ১ ঘণ্টা। পরিবহন কোম্পানি ও মানভেদে বিমান ভাড়া পড়তে পারে ৩,৭৯৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। দিনাজপুরে প্লেন থেকে নেমে গাড়িতে করে দিনাজপুর পর্যন্ত যেতে হবে।

দিনাজপুর সদর থেকে পাওয়া যাবে রামসাগর যাওয়ার অটোরিকশা বা সিএনজি। এই যাত্রায় সময় লাগবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। এছাড়া শহরের কাচারি ঘুণ্টি মোড়ে ইজিবাইক পাওয়া যায়, যেগুলো জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় নিয়ে যায় রামসাগর মোড় পর্যন্ত।

রামসাগর দীঘি ঘুরতে যেয়ে যা যা দেখতে পাবেন

পূর্ণিমা রাতে ক্যাম্পিংয়ের জন্য সেরা স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম রামসাগর দীঘি। দীঘির চারপাশে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত পায়ে চলা পথের দুই পাশে লাগানো হয়েছে মুছকন্দ, দেবদারু ও ঝাউ গাছ। পাড়ের কাছাকাছি অংশে আরও রয়েছে কাঁঠাল, আম, জাম, হরীতকী, সেগুন, আমলকী, জারুল, কাঁঠালিচাঁপা, কাঞ্চন, নাগেশ্বর এবং বটসহ ১৫২ রকমের গাছ।

দীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা উদ্যানটিতে রয়েছে ৭টি পিকনিক স্পট। স্পটগুলোতে আছে- ক্যাফেটেরিয়া, বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি দিয়ে গড়া শিশুপার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানায় দেখা যাবে হরিণ, অজগর সাপ, বানর, মুখপোড়া হনুমান ও ময়ূর।

উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা একটি পাঠাগার, যেটি বানানো হয় ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর। রামসাগরের উত্তর পার্শ্বের প্রাচীন মন্দিরটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্বীকৃত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এই উঁচু গোলাকার মন্দিরের অভ্যন্তরে রয়েছে তিনটি কক্ষ। পরিচর্যার অভাবে বর্তমানে ভগ্নপ্রায় মন্দিরটি ঢাকা পড়েছে ঘন গাছগাছালিতে। দীঘির পশ্চিম দিকে রয়েছে সুদৃশ্য একটি দ্বিতল ডাকবাংলো।

পুরো রামসাগর উদ্যান ভালোভাবে ঘুরে দেখার জন্য একটি দিনই যথেষ্ট/সংগৃহীত

রামসাগর ভ্রমণের সেরা সময়

বছরের ১২ মাসই ঘুরতে যাওয়ার উপযোগী এই দীঘি। তবে মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে এখানে বসে বারুণি মেলা। প্রতিবছর এই দিনটিতে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা এখানে আসেন দীঘির পানিতে স্নান করতে। এই স্নান প্রথাটির নেপথ্যে রয়েছে দীঘিতে আত্মবিসর্জন দেওয়া লোককথার সেই রাজপুত্র রামনাথের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন। এছাড়া হাজার হাজার অতিথি পাখির মিলনমেলা দেখতে হলে রামসাগর যেতে হবে শীতকালে। 

রামসাগর দীঘি ভ্রমণকালে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

এখানকার সুদৃশ্য রেস্ট হাউজে থাকতে হলে অনুমতি নিতে হবে স্থানীয় বন বিভাগ থেকে। একতলার ভবনটিতে রয়েছে তিনটি নন-এসি ও একটি এসি রুম। নন-এসি রুম ভাড়া প্রতি রাতের জন্য ৫০০ টাকা আর এসি রুম ভাড়া এক হাজার টাকা। উদ্যানের বাইরে গ্রাম বা ইউনিয়নে আর কোনো আবাসিক হোটেল নেই। তাই একমাত্র বিকল্প হচ্ছে দিনাজপুর শহরে চলে যাওয়া।

জেলা সদরে পর্যটন মোটেল রাত্রিযাপনের জন্য যথেষ্ট ভালো। ঢাকা থেকে এখানে অগ্রিম বুকিং দিয়ে যাওয়া যায়। এখানকার রুমগুলোতে ভাড়া পড়তে পারে ১,৫০০ থেকে ২,২০০ টাকা। এছাড়া শহরের স্টেশন রোড, গণেশতলা, মালদহপট্টি, নিমতলা ও চারুবাবুর মোড়ে সাধারণ মানের কিছু হোটেল রয়েছে, যেগুলোতে ২০০ থেকে ১ হাজার টাকায় থাকা যায়।

উদরপূর্তির জন্য এখানকার গরুর মাংস ভুনা ও কাঠি কাবাব বেশ মুখরোচক। পুলাহাট বিসিক এলাকায় ভাতের সঙ্গে গরু বা মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি সাশ্রয়ীভাবে আহার সেরে নেওয়ার ভালো একটি উপায়। এছাড়া দিনাজপুরের স্থানীয় বিশেষ খাবারের মধ্যে রয়েছে- পাটিসাপ্টা পিঠা, লিচু, চিড়া, কাটারিভোগ চালের ভাত, কলিজা ও মগজ ভুনা, পাপড়, সরিষাফুল দিয়ে ডিমভাজি ও  কালোজাম মিষ্টি।

ভ্রমণকালীন কিছু সতর্কতা

রামসাগর উদ্যানের আশেপাশের এলাকায় মাদক ব্যবসায়ের কারণে তা সন্ত্রাসী ও মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে। এদের কারণে পর্যটকরা মাঝে মধ্যে হয়রানির শিকার হন। তাই যথেষ্ট বড় দল নিয়ে সেখানে ঘুরতে যাওয়া উচিত। উদ্যানের প্রতিটি জায়গা যার নখদর্পণে রয়েছে এমন স্থানীয় কাউকে সঙ্গে রাখা আবশ্যক। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের যোগাযোগ নাম্বার সঙ্গে রাখা উচিত।

পরিশিষ্ট

শত বছরের প্রত্নতত্ত্ব ও লোক-সংস্কৃতি নিয়ে দিনাজপুরের রামসাগর দীঘি প্রতিনিধিত্ব করছে দেশের ঐতিহাসিক পর্যটন এলাকাগুলোকে। পুরো রামসাগর উদ্যান ভালোভাবে ঘুরে দেখার জন্য একটি দিনই যথেষ্ট। কিন্তু ঢাকা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় দিনের অধিকাংশ সময় কেটে যাবে যাতায়াতে। তাই দেশের উত্তর-পশ্চিমের এই দর্শনীয় স্থানটি ভ্রমণের জন্য ন্যূনতম ২ দিন হাতে নিয়ে রওনা দেওয়া উচিত। তাছাড়া বারুণি মেলা আর শীতের ভোরে অতিথি পাখি দেখতে হলে কোনোভাবেই ঝটিকা সফরের কথা ভাবা যাবে না।