মিথ বনাম বাস্তবতা: আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কি সত্যিই কি দুর্বল পুরুষের পরিচয়?

আমাদের সমাজে নারী ও পুরুষদের নিয়ে যেসব মিথ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো- পুরুষরা আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ করতে পারবেন না। এটি করা মানেই যেন তাদের দুর্বলতার প্রকাশ। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সে সম্পর্কে-

মিথ: আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ কি দুর্বল পুরুষের পরিচয়

বাস্তবতা: মানুষ যা দেখে না, তা সে হতেও পারে না- এটি মোটাদাগে একটি জীবনাদর্শন ভিত্তিক উক্তি হলেও কথাটি আজকের পুরুষদের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের জনসাধারণ ও জনসংস্কৃতির সামষ্টিক অবচেতনে পৌরুষের একটি অজেয় কঠোর ভাবমূর্তি আছে। কেবল লিঙ্গের বিচারেই সে শ্রেষ্ঠ তা নয়; দেহ ও মনে, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতায়- সবদিকেই দৃঢ় ও উত্তম। অন্যদিকে, নারীকে চিত্রিত করা হয়েছে পুরুষের বিপরীত সত্ত্বা হিসেবে। আবেগ, মমতা ও কোমলতাই যেন নারীর পরিচয়। পৌরুষ ও নারীত্বের মধ্যে এই বিভাজক রেখা সৃষ্টি করে পিতৃতান্ত্রিক আদর্শ। পৌরুষের যেখানে হওয়ার কথা ছিল নারীত্বের সম্পূরক, সেখানে তা হয়েছে নারীত্বের কর্তা। কারণ, লিঙ্গনির্বিশেষে যেকোনো মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে একটি বড় ভূমিকা রাখে তার আশেপাশের বিদ্যমান আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। সেইসঙ্গে থাকে অপরের চোখে নিজেদের বিনির্মাণের প্রচেষ্টা- আত্নপরিচিতির সামাজিক স্বীকৃতি। আমাদের সমাজে এই আদর্শগুলো মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা পূর্বনির্ধারিত কিছু রীতিনীতি।

এই প্রত্যাশার ভার নিয়ে বড় হতে হতে পুরুষ শেখে সংবেদনশীল হওয়া ও অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ তার জন্য অনুমোদিত নয়। যেহেতু, এসব নারীসুলভ, তাই পুরুষদের ক্ষেত্রে তা দুর্বলতা বা কাপুরষতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

কিন্তু অনুভূতির কি কোনো লিঙ্গ থাকে?

হিউমান ইন্সটিন্ক্ট বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে জন্মগতভাবে উৎপন্ন ও বংশগতভাবে প্রাপ্ত কিছু বৈশিষ্ট্যের সেট। তাই জন্মের পর কোনো শিশুর মধ্যে কোনোরূপ “মেয়েবোধ” বা “ছেলেবোধ” কাজ করেনা, কাজ করে শুধু এই ইন্সটিন্ক্ট। সে তখন জানে ব্যাথা পেলে কাঁদতে হয়, বহিঃপ্রকাশ করতে হয়, তার অনুভূতি সকলকে জানাতে হয়। কারণ, এটাই হিউমান ইন্সটিন্ক্ট। কিন্তু পরে এই হিউমান ইন্সটিন্ক্ট বিভাজিত হয় রূপ পায় মেইল ইন্সটিন্ক্ট আর ফিমেইল ইন্সটিন্ক্ট নামে। জন্মগতভাবেই প্রতিটি মানুষের মধ্যে নারীসত্ত্বা ও পুরুষসত্ত্বা থাকলেও, বেড়ে উঠতে উঠতে তার মধ্যকার কোন সত্ত্বা প্রাধান্য পাচ্ছে সেই হিসেবে তার মনোজগতের পরিবর্তিত হয়। ঐরূপ হরমোনই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এক সাধারণ পরিচয় থেকে এই যে পৃথকীকরণের সূচনা ঘটে, এতে হরমোনের চেয়েও বেশে ভূমিকা রাখে সোশ্যাল স্কুলিং। এটি পিতৃতান্ত্রিকতার পদ্ধতিগত শিক্ষারই একটি নামান্তর মাত্র। এই সোশ্যাল স্কুলিং হল একটি বিভাজক রেখা- নারীর সাথে পুরুষের, নারীত্বের সঙ্গে পৌরুষের।  তাই সোশ্যাল স্কুলিং মেয়েদের যেখানে শেখায় আবেগপ্রবণ হতে, ছেলেদের শেখায় আবেগ চাপতে। নারী যদি হয় শরীরে ও মনে দুর্বল তাহলে পুরুষদের হতে হবে শক্ত ও অটল। এই যে একটা ধারণা, পৌরুষ মানেই নারীত্বের পরিহার, এবং নারী মাত্রই কোমল, দুর্বল ও সংবেদনশীল- এসব কারণেই মূলত পুরুষরা তাদের দুর্বলতা কিংবা অনুভূতি লুকাতে অভ্যস্ত হন।

কিন্তু পুরুষরা নিজেদের “শক্ত” সাব্যস্ত করার মানে এই না যে তাদের মধ্যে কোনো অনুভূতি কাজ করেনা। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষরাও নারীদের মতো সমপরিমাণে এবং সমানভাবেই সব আবেগ অনুভব করে। কিন্তু পুরুষের জন্য সংবেদনশীল হওয়া এবং অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশের বিষয়টি একেবারেই অনুমোদিত নয়। বরং এটাকে তার দুর্বলতা হিসেবে দেখার যে ঐতিহাসিক চল আমাদের সমাজে রয়েছে, তা তাদের মনোজগৎকে বোধ করি আরও জটিল করে তোলে। এসব কারণে তাদের প্রাথমিক আবেগকে তারা অন্যান্য কোনো সামাজিকভাবে স্বীকৃত আবেগের মাধ্যমে চালিত করে। যেমন: একজন বিষণ্ণ বা দুঃখী পুরুষকে কাঁদতে বা ভেঙে পড়তে দেখার চেয়ে বেশি রাগান্বিত বা আক্রমণাত্মক আচরণ করতেই বেশি দেখা যায়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরুষরা তাদের অনুভূতি প্রকাশ্যে আলোচনা করার পরিবর্তে রাগ বা আগ্রাসনের মতো আরও “গ্রহণযোগ্য” আউটলেটের মাধ্যমে তাদের আবেগ প্রকাশ করার সম্ভাবনা বেশি। এর ফলে আবেগের অভ্যন্তরীণকরণ হতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি যেমন হতাশা বা উদ্বেগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ পৌরুষের শোভা বৃদ্ধি করে

অনুভূতি, এর আত্নপ্রকাশ ও বহিঃপ্রকাশ এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার করার সক্ষমতা একটি মানুষকে আরও মানুষ করে তোলে। সেটা নারী হোক কিংবা পুরুষ। অন্যদিকে, অনুভূতি প্রকাশে যখন বাধা সৃষ্টি হয়, তখন হয় সেটি চাপিয়ে রাখতে হয় অথবা, অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করতে হয়। অনুভূতি একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া, যার দমন সম্ভব নয়, অতঃপর বেছে নিতে হয় বিকল্প। অনেক গবেষণায় রাগকে একটি গৌণ আবেগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, রাগ এমন একটি অনুভূতি, যা ভয় বা দুঃখের মতো আবগকে অন্তর্নিহিত করতে ব্যবহৃত হয়। অনেক গবেষণায় উঠে এসেছে, পুরুষের রাগ বা বিরক্তির পেছনে অনেকক্ষেত্রে হতাশার সঙ্গে মোকাবিলা, বিশেষ করে যখন তা মানসিক চাপ বা লজ্জার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। অথচ, আমাদের সমাজে ছেলেদের কোমল দিকের চেয়ে রাগান্বিত দিকটিই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠায়, পুরুষরা তাদের কোমলতা বা দুর্বলতাকে অস্বীকার করে তাদের আগ্রাসনকেই শ্রেষ্ঠ বানিয়ে তোলেন। এটি ধরেই তারপর শুরু হয় টক্সিক মাসকুলিনিটির একটি প্রক্রিয়া।

"ইউথ পলিসি ফোরাম ও অধিকার এখানে, এখনই" প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি প্রথম পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন www.ypfbd.org।
এই সিরিজে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।