রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্ক্যাবিস সম্প্রতি উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এই ছোঁয়াচে চর্মরোগে—বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, অফিসকর্মী এবং নবজাতকদের মধ্যে রোগটির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। জনবহুল এলাকাগুলোর মধ্যে বস্তি, গণপরিবহন, ছাত্রাবাস, গার্মেন্টস এলাকা ও নিম্নবিত্ত আবাসনগুলোতে রোগটি দ্রুত ছড়াচ্ছে।
তবে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই স্ক্যাবিস একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, দরিদ্র এলাকাগুলোর শিশুদের ৫–৫০% পর্যন্ত স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। স্ক্যাবিস সবচেয়ে বেশি হয় গরম ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে, যেমন উন্নয়নশীল দেশের বস্তি বা নিম্নআয়ের বসতি।
তীব্র চুলকানি, ত্বকে ফুসকুড়ি, ঘা—এসব উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তরা ভোগেন শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তিতে। অনেক সময় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়, কর্মজীবীদের কাজ ব্যাহত হয়, এমনকি রাতে ঘুম হারাম হয়ে পড়ে।
দুঃখজনকভাবে, স্ক্যাবিসের চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও সচেতনতার অভাব, ভুল ধারণা, লজ্জাবোধ ও অপ্রশিক্ষিত ফার্মেসির ভুল পরামর্শের কারণে রোগটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আক্রান্তরা অনেক সময় সঠিক চিকিৎসা না নিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতি বা স্টেরয়েড ব্যবহার করেন, যা সাময়িকভাবে উপসর্গ চাপা দিলেও পরে রোগটি আরও খারাপভাবে ফিরে আসে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই বিষয়ে জরুরি সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এখন সময়ের দাবি। শুধু একটি মলম বা ট্যাবলেট নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যনীতি, পরিচ্ছন্নতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
স্ক্যাবিসের জীবনচক্র
স্ক্যাবিস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
স্ক্যাবিস হলো একটি পরজীবী (Sarcoptes scabiei) দ্বারা সৃষ্ট চর্মরোগ, যা ত্বকের নিচে গর্ত করে ডিম পাড়ে। এতে চুলকানি, লাল ফুসকুড়ি ও ত্বকে ঘা সৃষ্টি হয়। এটি খুবই ছোঁয়াচে এবং একে অপরের সঙ্গে ঘন সংস্পর্শে এলে সহজে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন: ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যানবাহন লোকাল বাস, বাজার, মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ।
কারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত?
- শিশু ও নবজাতক: অনেক আবাসিক স্কুল ও মাদ্রাসাগুলোতে অনেক শিশু একসঙ্গে ঘুমায় বা খেলাধুলা করে, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।
- নিম্নবিত্ত পরিবার: যারা বস্তি বা ছোট ঘরে একাধিক সদস্য নিয়ে বসবাস করেন, তাদের মাঝে এই রোগের প্রকোপ বেশি।
- অফিস ও শ্রমজীবী মানুষ: লঞ্চ, বাস, মেস বা শেয়ারড অফিস স্পেসে যারা থাকেন, তারাও ঝুঁকিতে থাকেন।
- গণপরিবহন: ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলোতে সাধারণত ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী ধারন করে। যা থেকেও ঝুঁকি থাকে সংক্রমণের।
সচেতনতার অভাবই প্রধান অন্তরায়
অনেক মানুষ স্ক্যাবিসকে সাধারণ চুলকানি ভেবে অবহেলা করেন। ফার্মেসি থেকে ভুল ওষুধ নিয়ে ব্যবহার করেন, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও রোগটি ফিরে আসে আরও খারাপভাবে। কেউ কেউ রোগ লুকিয়ে রাখেন, যার ফলে অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
স্ক্যাবিসের চিকিৎসা সহজ—পারমেথ্রিন বা ইভারমেকটিন ব্যবহারে এটি সেরে যায়। তবে সেটি অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করেত হবে। নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। এছাড়া, শুধু আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা নিলেই হবে না, তার পরিবারের সবাইকেও চিকিৎসা নিতে হয়। একইসঙ্গে জামাকাপড়, তোয়ালে, বিছানাপত্র গরম পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হয়।
করণীয়
- স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মলম বা ক্রিম ব্যবহার করা। যেমন: পারমেথ্রিন (Permethrin) মলম বা ক্রোটামিটন (Crotamiton) লোশন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ ব্যবহার না করা
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা- স্কুল ও বস্তিতে স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা
সমাধান কোথায়?
সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে স্ক্যাবিস বিষয়ে আলাদা সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালু করা প্রয়োজন। মিডিয়া এবং এনজিওদেরও উচিত স্ক্যাবিস নিয়ে নিয়মিত প্রচার চালানো।
স্ক্যাবিস এখন শুধু একটি চর্মরোগ নয়—এটি হাজারো পরিবারের জন্য একটি সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সংকট। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি আরও বিস্তৃত হবে। সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং চিকিৎসা গ্রহণই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে।