ছোটগল্প না উপন্যাস, কোথায় বেশি জীবনের আস্বাদ?

ছোটগল্প না উপন্যাস – কোনটি বেশি ভালো লাগে? এমন প্রশ্নের উত্তর কখনোই সহজ নয়। একসময় ছিল, ফাঁকি দিতে গিয়ে ছোটগল্প পড়ে কাজ সারতাম। কম সময়ে শেষ করা যায়, পরীক্ষার জন্যও সুবিধা। কিন্তু কিছু বই এমনভাবে মনের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল যে উপন্যাসের প্রতি ভালোলাগা আর থামানো যায়নি।

উপন্যাস বড় হয়। বিশাল। কখনো কখনো এক মাস লেগে যায় শেষ করতে। ছোটগল্প পড়ে যেমন মনে হয়, “শেষ হয়েও শেষ হলো না”, কবিগুরুর সেই কথা যেন সত্যি হয়ে যায় –

                                                                                                   “অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
                                                                                                                শেষ হয়ে হইল না শেষ।”

ছোটগল্পের এই অসম্পূর্ণতা, এই চমক – অনেকের ভালো লাগলেও আমি ভালোবাসি বিস্তারিত বর্ণনা, চরিত্রের স্তর থেকে স্তরে প্রবেশের অনুভূতি।

আমার উপন্যাস পড়ার প্রেম শুরু হয় ক্লাস নাইন-টেনে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “প্রথম আলো” দিয়ে। ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য, রবীন্দ্রনাথ, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ থেকে লর্ড কার্জন – কতগুলো চরিত্র, তাদের জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের জট, ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা মানুষগুলো। প্রথমবারের মতো বুঝেছিলাম, উপন্যাস মানে শুধু গল্প নয়, উপন্যাস মানে একেকটি জগত।

আমার প্রিয় উপন্যাসগুলোর কথা বলতেই হয়। যেমন –

  • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত, যেখানে অন্নদা, রাজলক্ষ্মী, অভয়া, কমললতা – প্রত্যেকেই চরিত্রের নতুন মাত্রা দেখায়।
  • রবীন্দ্রনাথের গোরা ও শেষের কবিতা, যেখানে অমিতের সূক্ষ্ম দর্শন চিন্তাজগতে আলোড়ন তোলে।
  • আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতা ও বকুলকথা, যেখানে নারীমনের লড়াই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
  • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের পার্থিব ও দূরবীন, যেখানে হেমাঙ্গ বা কৃষ্ণকান্তের চরিত্র বিশ্লেষণ বোঝায়, মানুষ কখনোই একমাত্রিক নয়।
  • হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা, মেঘ বলেছে যাব যাব – এমন কিছু উপন্যাস আছে, যা বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। আমাদের ভাবতে বাধ্য করে – মানুষের জীবন কি চক্রের মতো? যার শুরু নেই, শেষ নেই?
    হুমায়ূন লিখেছিলেন –   “প্রতিটা মানুষ কোন না কোন অপেক্ষায় থাকে। অপেক্ষা ছাড়া মানুষ বাঁচে না। অপেক্ষা শেষ হলে মানুষ মারা যায়।” মেঘের দিকে তাকালেই মনে হয়, আকাশের মেঘেরা কি কোথাও যেতে চায়? নাকি ওরাও অপেক্ষায় থাকে?

তবে হ্যাঁ, ছোটগল্পও একটি শিল্প। কম কথায় গভীর অর্থ পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ নয়। তবু, আমি বিস্তারিত ভালোবাসি। বইয়ের ভেতর হারিয়ে যেতে ভালোবাসি। বহু চরিত্র, বহু ঘটনা, বহু স্তর – যেখানে একেকটি উপন্যাস পড়া মানে জীবনের অন্যরকম স্বাদ নেওয়া।

শেষে বলতেই হয় - দুটোই ভালো, কিন্তু উপন্যাসেই খুঁজে পাই জীবনকে ছুঁয়ে দেখার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

ছোটগল্পে শেষ হয়েও শেষ হয় না। আর উপন্যাস? সেখানে শেষের পরও চরিত্ররা রয়ে যায় জীবনের মতোই।