গাছেরা হাঁটতে পারে না, কিন্তু বন কীভাবে পারে!

হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র “দ্য লর্ড অব দ্য রিংস” সিনেমার কথা মনে আছে? ওই সিনেমার দ্বিতীয় পর্ব “দ্য টু টাওয়ারস”-এ “এন্টস” নামক একটি গাছ দেখানো হয়েছে, যেই গাছ ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম বাসিন্দা এবং তারা বনের রক্ষক।

সিনেমায় দেখানো হয়, “এন্টস” নামক এই গাছ প্রাণীদের মতো যুদ্ধ করতে চলতে থাকে মাইলের পর মাইল, অন্ধকার বন পেরিয়ে পৌঁছে যায় জাদুকর সারুমানের দুর্গে। সেখানে তারা পাথর ছুঁড়ে, দেয়াল টপকে, এমনকি বাঁধ ভেঙে শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করতে দেখা গেছে।

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী আর ফ্যান্টাসি জগতে এমন চলমান গাছের অভাব নেই। “গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি”-এর চরিত্র “গ্রুট” ডালপালা দিয়ে তৈরি এক পাখা তাকে উড়তে সাহায্য করে। ভিডিও গেম “দ্য লিজেন্ড অব জেল্ডা: টিয়ারস অব দ্য কিংডম”-এ এভারমিন নামের গাছগুলো লড়াই করে লিংকের সঙ্গে। হ্যারি পটার সিরিজের “উইপিং উইলো” তো কাউকে কাছে আসতে দেখলেই গুঁতো দেয়।

আমাদের চারপাশের গাছগুলো এদের মতো চলাফেরা করে না বটে, কিন্তু প্রকৃতির গাছ ও বনও চলমান থাকে- তবে অবশ্যই অনেক ধীরে।

সুন্দরবন/ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

সব গাছই কি চলে!

গাছের বীজ থেকে চারা বেরিয়ে যখন সূর্যের দিকে বাড়তে থাকে, তখন আসলে সব গাছই চলে। তবে বীজ যদি অন্ধকার জায়গায় পড়ে, তখন সূর্যের আলো পেতে ধীরে ধীরে শাখা-পল্লব প্রসারিত করে। এই প্রক্রিয়াকে বলে “ফটো ট্রপিজম”।

গাছের শেকড়ও নড়ে। মাটির কোথায় বেশি আর্দ্রতা আছে, তা টের পেলে শেকড় সেদিকেই প্রসারিত করে। এইভাবে কখনও কখনও শেকড় নলকূপ, পাইপলাইন, এমনকি টয়লেটে পর্যন্ত ঢুকে পড়ে।

এই বিষয়ে কোস্টারিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিশেষজ্ঞ জেরার্ডো আভালোস বলেন, “কখনও কখনও শেকড় মানুষের টয়লেটেও ঢুকে যায়।”

বন কীভাবে চলে?

একটি গাছ পাহাড় টপকাতে পারবে না, নদীও পার হতে পারবে না। কিন্তু বন পারে। তবে এই যাত্রা অত্যন্ত ধীরে হয়। উদাহরণ হিসেবে, শেষ বরফ যুগে যখন কানাডা ও উত্তর আমেরিকার বড় অংশ বরফে ঢাকা ছিল, তখন অনেক গাছই দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চলে সরতে শুরু করে। বরফ নামার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের গাছগুলো মারা যায়, আর দক্ষিণে নতুন বীজ থেকে চারা গজায়। এভাবে ধীরে ধীরে পুরো বনই দক্ষিণে সরে যায়। বছরে প্রায় ১০০ থেকে ৫০০ মিটার পর্যন্ত সরতো এই বনের রেখা।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভয়াবহ। মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটছে যে বন আর সামলাতে পারছে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনকে হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন (ম্যানগ্রোভ) উপকূলীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কানাডার উষ্ণ তাপমাত্রা হোয়াইট স্প্রুস গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত রয়েছে। আবার, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাইনিওন পাইন গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত খরায়।

এই বিষয়ে মার্কিন বন পরিষেবার সাবেক পরিবেশবিদ লেসলি ব্র্যান্ডট বলেন, “গাছগুলো আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তাই মানুষই এখন তাদের সহায়তা করছে।”

মানুষের সহায়তায় বন স্থানান্তর

গবেষকরা বীজ রোপণ করছেন নতুন এলাকায়, যেখানে জলবায়ু ও মাটি তাদের জন্য উপযোগী। এমনকি কিছু কিছু জায়গায়, যেখানে পুরনো প্রজাতির গাছ টিকে থাকতে পারছে না, সেখানে নতুন উপযোগী প্রজাতি রোপণ করা হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী মিসিসিপি। এই নদীর পাড়ের বনাঞ্চলে ব্র্যান্ডট দেখেছেন, বন্যা আর পোকামাকড়ের আক্রমণে সিলভার ম্যাপল গাছগুলো মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এমন গাছ লাগানোর চেষ্টা করছি যেগুলো এই পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে, যেমন কটনউড আর উইলো।”

উত্তর মিনেসোটার সুপিরিয়র ন্যাশনাল ফরেস্টের জন্য তারা একটি গাইডবুক তৈরি করেছেন, যেখানে বন ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্র্যান্ডট বলেন, “আমরা পুরো বনটাকে বদলে দিতে চাই না। কারণ মানুষ এই গাছগুলোর ওপর নির্ভর করে।”

সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানভিত্তিক পত্রিকা সায়েন্স নিউজ