হঠাৎ ইরানে হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প, নেপথ্যে কী

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পাঁচ মাস পর নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো থেকে সাময়িকভাবে পিছু হটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল ইরানে নতুন করে কোনো হামলা চালাবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার বিপরীতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এটিকে ‘নতুন মিথ্যাচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরান।

রবিবার (২ আগস্ট) ভোরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বিশেষ পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি বন্ধুরাষ্ট্র তাকে সামরিক অভিযান স্থগিত করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে, কারণ ইতোমধ্যেই একটি ‘সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখা’ তৈরিতে সব পক্ষ একমত হয়েছে।

ট্রাম্প তার পোস্টে লেখেন, ‌‌‘‘বিশ্বের শান্তিময় ভবিষ্যতের স্বার্থে এবং একটি সমৃদ্ধ ইরানের টিকে থাকার নিশ্চয়তায় আমি প্রস্তাবিত হামলা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে শর্ত হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। চুক্তির প্রাথমিক শর্ত হলো: অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণভাবে ‘হরমুজ প্রণালি’ খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির চূড়ান্ত অবসান ঘটানো। ইসরায়েলও এই শর্তাবলি এবং প্রতিশ্রুতির সাথে একমত পোষণ করেছে।’’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি ও অনুরোধের দাবিকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, হামলা স্থগিতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রকার অনুরোধ জানানো হয়নি এবং ট্রাম্পের এই বক্তব্য ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে ‘সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে’ রয়েছে এবং শত্রুর যেকোনো আক্রমণ বা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানানো হয়।

এদিকে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মজিদ ইবনে আল-রেজা সংবাদমাধ্যমকে জানান, মার্কিন হুমকির প্রতিটি পদক্ষেপকে তেহরান বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবেই গ্রহণ করে। তাই ইরান কোনো অবস্থাতেই অপ্রস্তুত বা নিষ্ক্রিয় থাকবে না। এর আগে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থা-সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম ‘নুরনিউজ’ সতর্ক করে জানিয়েছিল, মার্কিন বাহিনী ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হানলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইসরায়েলের তেল-গ্যাসক্ষেত্রে পাল্টা ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে।

তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হামলা স্থগিতের পেছনে কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি আমেরিকার নিজস্ব সামরিক ঘাটতিও একটি বড় কারণ। সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ‘প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টর’-এর মজুত ছিল প্রায় ২,৩০০টি, যা দীর্ঘ সংঘাতের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে কমে এখন ৮২৭টির নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ এবং ইয়েমেনের হুতিদের কারণে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি এমনিতেই কঠিন সংকটে রয়েছে। ট্রাম্প ও তেহরানের মধ্যকার এই নতুন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা নতুন চুক্তির বার্তা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান নিয়ে আসে নাকি সাময়িক বিরতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তা পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।