পশ্চিমবঙ্গে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে

গভীর রাতে মুসলিমদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে কোথায় পাঠাচ্ছে পুলিশ?

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে ‘বাংলাদেশি’ নাগরিক সন্দেহে মুসলিমদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। 

স্ক্রল ডট ইন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে অন্তত নয়জন মুসলিম পুরুষ ও দুটি শিশুকে এভাবে আটক করা হয়েছে। এদের একজন ছাড়া বাকিদের বাড়ি মুর্শিদাবাদে।

মুর্শিদাবাদের রামাকান্তপুর গ্রামের ৬১ বছর বয়সী ইব্রাহিম শেখকে গত ২৯ জুলাই মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। পারবিন খাতুনের ভাষ্য, সাত-আটজনের একটি দল বাড়িতে এসে ইব্রাহিমের পরিচয়পত্র দেখতে চায়। নথি দেখানোর পর তাকে ভারতীয় নাকি বাংলাদেশি - এমন প্রশ্ন করা হয়। ইব্রাহিম নিজেকে ভারতীয় বললেও তাকে বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের দাবি, ইব্রাহিমের আধার, ভোটার কার্ড, পেনশনের কাগজপত্র ও জমির দলিলসহ বিভিন্ন নথি থাকার পরও তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি। একদিন পর পুলিশ জানায়, তাকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। এরপর থেকে তার অবস্থান জানতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও সন্ধান পাননি স্বজনেরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের অন্তত চারজন সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। ইব্রাহিমের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে করা আপিলও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

আটক ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাতে বাড়িতে গিয়ে পুলিশ তাদের তুলে নেয় এবং আটকের সময় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এফআইআর বা অন্য কোনো নথি দেখানো হয়নি। কিছু ঘটনায় আটকের কয়েক সপ্তাহ পর স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করা হয়েছে।

এদিকে ইব্রাহিমের পরিবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট তার ৮১ বছর বয়সী মা হানিফা বেওয়া হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন করেন। তবে রাজ্য সরকার দাবি করেছে, হানিফা ইব্রাহিমের জন্মদাত্রী মা নন। ইব্রাহিমের আইনজীবী মো. নূর হোসেন জমাদার জানান, হানিফা তার খালা ছিলেন এবং তাকে দত্তক নিয়েছিলেন। তার দাবি, অ্যারেস্ট মেমো বা এফআইআর ছাড়া এভাবে কাউকে আটক রাখা যায় না। 

অন্যদিকে সুতি থানার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা অভিজিৎ বসু মল্লিক দাবি করেন, সরকারের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী এসব আটক করা হয়েছে এবং এর জন্য এফআইআরের প্রয়োজন নেই। জঙ্গিপুরের পুলিশ সুপার সুরিন্দর সিংও বলেন, নির্ধারিত নির্দেশনা মেনেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ১৯ জুন উত্তর দিনাজপুরের ৬৭ বছর বয়সী জলিল আখতারকে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা হয়। পরে তাকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা হলেও বিএসএফ তাকে ফিরিয়ে দেয় বলে পুলিশের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর তার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা করা হয়।

মুর্শিদাবাদের ২৮ বছর বয়সী সাহিন শেখকেও ১৪ জুন বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আটকের ২০ দিন পর তার বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত এফআইআর করা হয়। পরিবার জানিয়েছে, তার কাছে জমির দলিল, রেশন কার্ডসহ বিভিন্ন নথি রয়েছে এবং নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে তিনি এসআইআর ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছেন।

এছাড়া আব্দুল জব্বার ও তার দুই শিশুসন্তান এবং জীবন শেখকেও একই ধরনের অভিযোগে আটকের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। জব্বারের পরিবারের দাবি, তার ভারতীয় পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার কার্ড রয়েছে। জীবন শেখের পক্ষের আইনজীবীর অভিযোগ, দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে এফআইআরের কপি বা আটকের কোনো আদেশনামা দেওয়া হয়নি।

মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা এসব আটকের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ তদন্ত ও আদালতে হাজির না করে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো আইনবিরুদ্ধ।