যুদ্ধের এক বছর: কিভাবে বিচ্ছিন্ন হলো সুদান

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ২০২৩ সালের এপ্রিলে সহিংস বিরোধে জড়ায় সুদানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে। এ যুদ্ধ এরইমধ্যে পার করেছে এক বছর। এতে নিহত-আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছে প্রায় নয় লাখ সুদান নাগরিক।

লড়াই এখনও চলছে। প্রায় পাঁচ কোটি জনগণের দেশ এখন দাঁড়িয়ে দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে।

এপ্রিল ২০২৩: বাজল যুদ্ধের দামামা

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল। আকস্মিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী খার্তুম। সুদানের ডি ফ্যাক্টো নেতা আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে জড়ায় তারই মিত্র তার সাবেক ডেপুটি মোহাম্মদ হামদান দাগলোর নেতৃত্বাধীন আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)।

২০২১ সালে সুদানের শক্তিশালী নেতা ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভ্যুত্থানের পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে ছিলেন বুরহান ও দাগলো।

যুদ্ধের আগে মূলত বুরহান আরএসএফকে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে একীভূত করার বিষয়ে ভাবছিলেন। কিছু দিনের মধ্যে ভোট হওয়ারও কথা ছিল। এরমধ্যেই আলোচনা ভেস্তে যায়।

আরএসএফ দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, সেনাপ্রধানের বাসভবন ও খার্তুম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের দখল নেওয়ার দাবি করে।

লড়াই শুরু হয় দারফুরের পশ্চিমাঞ্চলেও। ওই অঞ্চলে ২০০৩ সাল থেকেই লড়াইয়ে মশগুল ছিল আরব মিলিশিয়ারা জানজাউইদ (যা পরে আরএসএফ হয়ে ওঠে)। সেখানে অনারব সংখ্যালঘুদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য খার্তুম জানজাউইদকে নিয়োগ করেছিল। যা শেষ অব্দি খার্তুমের জন্য আপন হন্তারকের ভূমিকা নিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিদেশি দেশগুলো তাদের নাগরিকদের সুদান থেকে সরিয়ে নেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ৭২ ঘন্টার যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করে। তবে তা ভেঙে যায়। এরপরও একাধিক প্রচেষ্টা চলে। তবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

পারস্পরিক অবিশ্বাস

২০২৩ সালের মে মাসে লোহিত সাগরের বন্দর শহর জেদ্দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অংশ নেয় সেনাবাহিনী ও আরএসএফ। 

তবে সেনাবাহিনী ৩১ মে সেই আলোচনা ছেড়ে যায়। তাদের অভিযোগ, আরএসএফ যুদ্ধবিরতি প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর মধ্যেই খার্তুমে আধা-সামরিক বাহিনীর অবস্থানে বোমাবর্ষণ করে সেনাবাহিনী।

কাজ হয়নি মার্কিন খড়গেও

২০২৩ সালের ১ জুন যুদ্ধে জড়িত সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও উভয় যুদ্ধরত পক্ষের কর্মকর্তাদের জন্য ভিসা বিধিনিষেধ ঘোষণা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তবে এই বিধিনিষেধ একরকম থোড়াই কেয়ার করেছে যুদ্ধরত উভয় পক্ষ।

বরং এরইমধ্যে আধাসামরিক বাহিনী দাবি করে, খার্তুমে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমপ্লেক্স দখল করেছে তারা।

এছাড়া জুনেই একটি সৌদি টিভি চ্যানেলে এক সাক্ষাত্কারে আরএসএফ-এর সমালোচনা করার পরে বন্দী ও হত্যার শিকার হন পশ্চিম দারফুর রাজ্যের গভর্নর খামিস আবদুল্লাহ আবাকার।

যুদ্ধাপরাধ, তদন্ত

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই সুদানের যুদ্ধরত উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে যৌন ও লিঙ্গ-ভিত্তিক অপরাধসহ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠে। জুলাইয়ে এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে যুদ্ধ দুটি নতুন শহরে ছড়িয়ে পড়ে: উত্তর দারফুরের এল ফাশার ও পশ্চিম কর্দোফানের এল ফুলা।

জাতিসংঘ বলছে, পুরো সুদানে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের কারণে সুদানের ৫০ লাখ মানুষ তীব্র অনাহারের ঝুঁকিতে রয়েছে। যুদ্ধের কারণে দেশটিতে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ খাদ্যঘটতি চরম আকার ধারণ করেছে।

এরই মধ্যে খাদ্য অনিরাপত্তার সম্মুখীন হয়েছেন অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ সুদানি। এর মধ্যে ৫০ লাখ তীব্র অনাহারের ঝুঁকতে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুদানে সাত লাখ ৩০ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বলে মনে করা হচ্ছে।

পোর্ট সুদানে অস্থিরতা

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পোর্ট সুদানের কৌশলগত লোহিত সাগরের শহরটিতে উপজাতি মিলিশিয়াদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর প্রতি অনুগত সরকার আশ্রয় নিয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যস্ততায় ২৬ অক্টোবর জেদ্দায় শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো চুক্তি করতে পারেনি তারা।

আল-জাজিরা রাজ্য আরএসএফের কব্জায়

২০২৩ সালের ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় আল-জাজিরা রাজ্যকে দখল করে নেয় আধাসামরিক বাহিনী। বলা হচ্ছিল, ওই এলাকায় যুদ্ধের আঁচ লাগেনি।

তবে সেই শহর অনায়াসে দখল করে নেয় আরএসএফ। একই সময়ে সুদান সরকার অভিযোগ করে, ধনী উপসাগরীয় দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফকে সামরিক সহায়তা করছে। প্রতিবাদে সরকার আমিরাত থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে আনে।

একলা চলো নীতি সুদানের

পূর্ব আফ্রিকান ব্লক আইজিএডি এর এক সমাবেশে বুরহানের প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগলোকে আমন্ত্রণ জানানোর কারণে এই ব্লক ত্যাগ করে সুদান।

পশ্চিমা এবং আঞ্চলিক নেতারা দুপক্ষকে উত্তেজনা হ্রাস করা ও দেশটিতে বেসামরিক শাসন ফিরিয়ে আনার জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক দলগুলো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে রক্তপাত বন্ধে সহায়তা করারও আহ্বান জানিয়েছে।

সুদান অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। এরমধ্যেই সেনাবাহিনীর সাথে আধাসামরিক বাহিনীর এই সংঘাত দেশটির অর্থনীতিকে সমূলে ধবংস করতে পারে, ঠেলে দিতে পারে ভয়াবহ গোত্রীয় সংঘাতের পথে। এই সংঘাত নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টাকেও পথচ্যুত করবে।

উত্তর আফ্রিকার দরিদ্র দেশ সুদান অর্থনৈতিকভাবে আগে থেকেই ভঙুর অবস্থায় রয়েছে। দেশটির নানা আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সহিংসতার ইতিহাসও দীর্ঘ। এ অবস্থায় আরএসএফ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে চলতে থাকা সংঘর্ষ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো অনেক বেশি খারাপ করে তুলবে এমনটাই মনে করেন দেশটি নিয়ে আগ্রহ থাকা বৈদেশিক গোষ্ঠীগুলো।

যুদ্ধ থামার আশা আছে কি?

সাধারণ মানুষ যাতে সহায়তা পেতে পারে এজন্য আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছে বৈশ্বিক শক্তিগুলো। কোনো কোনোটায় সাড়া দিলেও তা নিয়ে আন্তরিকতা খুব কমই দেখিয়েছে দুই পক্ষ।

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশা, ঈদের পর আলোচনায় বসে বিরোধ মেটানোর পথে হাঁটবে যুদ্ধরত দুই পক্ষ।