দীর্ঘ সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
শুক্রবার (৫ জুন) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
চিঠিতে জেলেনস্কি বলেন, “ইউরোপের এই যুদ্ধ কবে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগের কেন্দ্রে ফিরবে, সেই অপেক্ষায় বসে থাকাটা ভুল হবে। শান্তি শুধু ইউক্রেন ও রাশিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই সম্ভব বলে জানান তিনি।”
তিনি প্রস্তাবিত আলোচনায় পূর্ণ যুদ্ধবিরতিরও দাবি জানান। তবে গত বৃহস্পতিবার দিনের শুরুর দিকে পুতিন এমন সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার মন্তব্য করেন, “দুই নেতার দেখা হলে সেটি দারুণ হবে।”
চিঠিতে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলার দিকে ইঙ্গিত করে জেলেনস্কি লিখেছেন, “২৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বয়স এখন পুতিনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।”
চিঠিতে সরাসরি আমন্ত্রণের সুরে জেলেনস্কি লেখেন, “ইউক্রেন আমাদের এবং আপনাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রস্তাব দিচ্ছে। আমি একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিচ্ছি।”
ইউক্রেনীয় নেতার পক্ষ থেকে এটি কোনো নতুন প্রস্তাব নয়। ক্রেমলিনও আগের মতোই উত্তর দিয়েছে, জেলেনস্কি চাইলে মস্কোতে গিয়ে পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
এই চিঠির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কিয়েভ প্রকাশ্যে স্বীকার করলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন পুরোপুরি ইরান ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। জেলেনস্কি লিখেছেন, ইউরোপের যুদ্ধটি আবারও তাদের মনোযোগের কেন্দ্রে ফেরা পর্যন্ত কেবল বসে থাকা ভুল হবে।
এদিকে সেন্ট পিটার্সবার্গে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে (চিঠির বিষয়বস্তু না দেখেই) পুতিন বলেন, “অবশ্যই ইউক্রেনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে প্রস্তুত ও আগ্রহী। তবে এর জন্য উভয় পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে।”
পুতিনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরান ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে আলোচনার মাধ্যমে ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি করাতে পারে।
পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ইউক্রেনকে রাশিয়ার দখলে থাকা চারটি অঞ্চল দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়ার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের চেষ্টা থেকেও সরে আসতে হবে।
অন্যদিকে ইউক্রেন স্পষ্টভাবে ভূখণ্ড ছাড়ার প্রস্তাব নাকচ করেছে। কিয়েভের মতে, এতে রাশিয়া আরও উৎসাহিত হবে এবং ২০২২ সালের মতো আবারও হামলা চালাতে পারে। ওই বছর রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করে এবং এর আট বছর আগে অবৈধভাবে ক্রিমিয়া দখল করে নেয়।
গত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি আলোচনা কার্যত থমকে গেছে। জেনেভা, আবুধাবি ও ইস্তাম্বুলে হওয়া পূর্ববর্তী শান্তি আলোচনা কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি।
১৮০০ শব্দেরও বেশি দীর্ঘ ওই চিঠিতে জেলেনস্কি লিখেছেন, “আপনার যুদ্ধ আমাদের দেশে যে ভয়াবহতা নিয়ে এসেছে, তারপর রুশ সেনাদের ভাগ্য নিয়ে আমরা ইউক্রেনীয়রা মোটেও চিন্তিত নই।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু আমি ইউক্রেনীয়দের নিয়ে চিন্তিত। আমরা আমাদের মানুষ হারাচ্ছি, আর প্রতিটি প্রাণহানি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানি সংকট ও ক্রমবর্ধমান দাম এবং যুদ্ধের কারণে রুশ নাগরিকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানান জেলেনস্কি। তিনি পুতিনের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, “এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথে হাঁটতে ভয় পাবেন না। এই মুহূর্তে আপনার কাছ থেকে এটাই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত।”
তিনি আরও বলেন, “ইউক্রেন আমাদের মধ্যে সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসানের প্রস্তাব দিচ্ছে।” জেলেনস্কি জানান, সুইজারল্যান্ড বা তুরস্কের মতো কোনো দেশে এই সরাসরি আলোচনা হতে পারে।
এছাড়া দুই দেশের মধ্যে ‘অল-ফর-অল’ ভিত্তিতে সব যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং যুদ্ধের সময় নিয়ে যাওয়া বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের দ্রুত ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিঠির শেষাংশে জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, “যদি রাশিয়া নিজ উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধ না করে, তাহলে ইউক্রেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।”
সবশেষে যুদ্ধের সব নিহত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘গ্লোরি টু ইউক্রেন’ স্লোগানের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শেষ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই চিঠিটি এমন এক দিনে এল যখন পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি বড় অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দিচ্ছেন। এর আগের দিনই কিয়েভ ওই শহরের উপকণ্ঠে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল, যেটিকে জেলেনস্কি তার বার্তায় সাক্ষাৎ করতে যাওয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে পুতিন এই বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “মিস্টার জেলেনস্কি ইউক্রেনের বৈধ প্রতিনিধি কি না, তা আইনজীবী এবং আইনি বিশ্লেষণের বিষয়।”



