ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি সত্যিই ওজন কমায়?

কয়েক মাস পরপরই অন্তর্বর্তীকালীন উপবাস বা ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’- এর উপকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে উপবাস করা কিংবা দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার এই পদ্ধতি ওজন কমানোর একটি জনপ্রিয় উপায় হিসেবে পরিচিত। সাধারণ ক্যালরি কমানোর ডায়েটের তুলনায় এটি ওজন কমাতে বেশি কার্যকর - এমন ধারণাও রয়েছে।

শুধু ওজন কমানো নয়, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো এবং স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার মতো নানা সুবিধার সঙ্গেও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে যুক্ত করা হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এসব দাবির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্য ডায়েটের তুলনায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কখনো বেশি কার্যকর হতে পারে, আবার কখনো কম কার্যকরও হতে পারে। এমনকি একটি গবেষণায় এর সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই বিষয়টির নানা বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক দিক। এমনকি আন্তর্জাতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অনিয়ন্ত্রিত বা ভুল নিয়মে উপবাস পালনের ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।

শিকাগোর ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, “ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে বিজ্ঞানীরাও সব বিষয়ে একমত নন।”

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, এই খাদ্যপদ্ধতিকে কি অতিরিক্ত প্রচার করা হয়েছে, নাকি একটি কার্যকর পদ্ধতি, যা মানুষের আয়ু বাড়াতে পারে?

গবেষকদের মতে, এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়ার পথে বড় বাধা হলো মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছে, তা সঠিকভাবে জানা কঠিন। ভারাডির ভাষায়, “একজন ব্যক্তি আসলে কী খাচ্ছেন, সে বিষয়ে গবেষকদের অনেক সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে না।”

ইঁদুরে যে ফল, মানুষের ক্ষেত্রে তা নয়

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের পেছনের একটি ধারণা হলো - মানুষের পূর্বপুরুষেরা বর্তমানের মতো দিনে তিন বেলা খাবার ও একাধিকবার নাশতা খাওয়ার পরিবেশে বিবর্তিত হননি। উপবাসের সময় শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া চিনি পোড়ানো থেকে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহারের দিকে যায়। এতে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন পুনর্ব্যবহার শুরু করে, যাকে অটোফ্যাজি বলা হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সুবিধাকে যুক্ত করা হয়।

তবে এই ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ এসেছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির ওপর করা গবেষণা থেকে। ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, একই পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করলেও খাবারের সময় সীমিত রাখা প্রাণীগুলো তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও ছিপছিপে ছিল। অন্যদিকে, অবাধে খাবার খাওয়া দলটি স্থূল ও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। মানুষের ক্ষেত্রে অবশ্য একই ধরনের স্পষ্ট ফল পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক ভারাডির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ধরন অনুযায়ী মানুষের ওজন প্রায় ৫% কমতে পারে। তবে অন্য যেকোনো ডায়েট কৌশলের মতো এটিও কার্যকর; ইঁদুরের ওপর দেখা নাটকীয় ফল মানুষের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়নি। সামান্য ওজন কমার সঙ্গে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো কিছু বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকও কমতে পারে। এমনকি পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের কিছু উপসর্গও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং পেশির ভর কমিয়ে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্মৃতিশক্তি ও ক্যানসার প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও প্রাণীর গবেষণার ফল মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে দেখা যায়নি।

মানুষের ক্ষেত্রে ফলাফল অস্পষ্ট কেন 

গবেষকদের মতে, এর একটি কারণ হলো মানুষ ও ইঁদুরের মৌলিক জৈবিক পার্থক্য। ইঁদুরের বিপাকীয় হার মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে ইঁদুরের ১৬ ঘণ্টার উপবাস মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক দিনের উপবাসের সমতুল্য হতে পারে। তাছাড়া গবেষণাগারে ব্যবহৃত ইঁদুরগুলো প্রায়ই জিনগতভাবে একই ধরনের হয়, যেখানে মানুষের মধ্যে বৈচিত্র অনেক বেশি।

তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত খাদ্যসংক্রান্ত তথ্য। মানুষ কী খাচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা অত্যন্ত কঠিন। প্রাণীর গবেষণায় গবেষকরা খাবারের পরিমাণ ও ধরন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের শুধু নির্দিষ্ট ডায়েট অনুসরণ করতে বলা হয় এবং ফুড ডায়েরি রাখতে দেওয়া হয়। এরপর তারা নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন কী খাবেন।

এমনকি সৎ ব্যক্তিরাও খাবারের হিসাব দিতে গিয়ে ভুল করতে পারেন। কেউ খাবারের কোনো অংশ লিখতে ভুলে যেতে পারেন, আবার কেউ নির্ধারিত সময়ের বাইরে খাওয়া খাবারের কথা ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিতে পারেন। ভারাডির গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মাত্র প্রায় অর্ধেক ফুড রেকর্ড জমা দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

খাবার গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণে ‘ডাবলি লেবেলড ওয়াটার’ পদ্ধতিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়গুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। এই পদ্ধতিতে বিশেষ আইসোটোপযুক্ত পানি ব্যবহার করে শরীর কত দ্রুত তা বের করে দিচ্ছে, তা পরিমাপ করা হয়। ২০২৫ সালের একটি সমীকরণে দেখা গেছে, মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি পর্যন্ত কম খাওয়ার কথা জানাতে পারে।

খাবারের হিসাব রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার 

মানুষ কী খাচ্ছে, তার আরও নির্ভুল তথ্য পেতে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছেন। কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাওয়ার সময় খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। আবার কোথাও চশমা বা নেকলেসে ক্যামেরা বসিয়ে খাবার গ্রহণের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ক্যামেরা ছাড়াও খাবার পর্যবেক্ষণে নতুন ধরনের প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চর্বণ শনাক্তকারী নেকলেস, স্মার্ট ফর্ক এবং দাঁতে বসানো নিউট্রিয়েন্ট সেন্সর। এসব প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আপাতত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে শরীরে প্রক্রিয়াজাত হওয়া পুষ্টি উপাদান পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।

নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন

গবেষকদের মতে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসের নির্ভুল তথ্য পাওয়া গেলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংসহ বিভিন্ন খাদ্যপদ্ধতি নিয়ে থাকা অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এই ঘাটতির সুযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সার প্রাণীর গবেষণার ফলকে মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য বলে প্রচার করছেন।

ক্রিস্টা ভারাডির মতে, এই সমস্যা শুধু ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে নয়; পুষ্টিবিষয়ক গবেষণার বড় একটি অংশই মানুষের খাদ্যগ্রহণের তথ্যের ওপর নির্ভর করে। ফলে গবেষণার ফল নিয়ে মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণও এখানেই।