পেট ভরে খাওয়ার মাত্র এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে আবার ক্ষুধা অনুভব করছেন? এরকম অনেকের সঙ্গেই হয়ে থাকে। পুষ্টিবিদ ও গবেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল ‘কম খাওয়া’ বা ‘বেশি খাওয়ার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাবারের ধরন, রক্তে গ্লুকোজের ওঠানামা, ফাইবারের পরিমাণ, ঘুম এবং খাওয়ার অভ্যাসের ওপর এটি বহুলাংশে নির্ভর করে।
সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় খাবারের পর দ্রুত ক্ষুধা লাগার বিভিন্ন কারণ ও এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। যেমন - অ্যাডিক্টিভ বিহেভিয়ার্স নামক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে, উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত খাবারও মিষ্টি এবং কার্বোহাইড্রেটের জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করতে পারে।
দ্রুত ক্ষুধা লাগার প্রধান কারণগুলো
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ডায়াবেটিস নেই এমন ৮৯৫ জন ব্যক্তির প্রায় ৭,৬৫০ খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, খাওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেলে তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হয় এবং ব্যক্তি তুলনামূলক দ্রুত পরবর্তী খাবার গ্রহণে বাধ্য হন।
খাবারে ফাইবারের অভাব
২০২৪ সালে বার্লিতে থাকা বিটা-গ্লুকান নামক ফাইবারের প্রভাব নিয়ে ৬৭ জন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ফাইবার খাবারকে ভারী করে হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রোটিনের অভাব
ভাত বা রুটির মতো কার্বোহাইড্রেট একা আপনাকে দীর্ঘ সময়ের জন্য তৃপ্ত রাখতে পারে না। আপনার খাবারে প্রোটিন যোগ করা প্রয়োজন, যেমন ডাল, মাছ, ডিম বা মুরগির মাংস।
দ্রুত খাবার গ্রহণের অভ্যাস
তাড়াহুড়ো করে খেলে পাকস্থলী পূর্ণ হওয়ার সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছানোর আগেই খাবার গ্রহণ শেষ হয়ে যায়। ফলে খাবার খাওয়ার পরও তৃপ্তির অনুভূতি আসে না।
অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট
বিস্কুট এবং সাদা পাউরুটির মতো চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আপনাকে ক্ষুধার্ত করে তোলে। এর পরিবর্তে প্রয়োজন কার্বোহাইড্রেটের সাথে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন এবং ফাইবার মিশিয়ে খাওয়া।
ঘুমের ঘাটতি ও হরমোনের পরিবর্তন
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনে পরিবর্তন আসতে পারে। অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে এবং আপনাকে আরও মিষ্টি ও উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করে।
ক্ষুধার বাইরেও মানসিক চাপ, একঘেয়েমি বা অভ্যাসগত আচরণের কারণে খাওয়ার তাগিদ দেখা দিতে পারে, এমনকী যদি আপনি এইমাত্র একটি ভারী খাবার খেয়েও থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও করণীয়
অ্যাডিক্টিভ বিহেভিয়ার্স জার্নালে বলা হয়েছে, প্রোটিনের সঙ্গে পরিমিত জটিল কার্বোহাইড্রেট যোগ করলে খাবারের পর এই ধরনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট খুব বেশি পরিমাণে বাদ না দিয়ে সুষম ও মিশ্র পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার খাওয়া। এছাড়া আরও কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি -
- বেশি খাওয়ার পরিবর্তে সুষম খাবার প্রস্তুত করা
- ধীরে ধীরে খাওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান এবং যথেষ্ট ঘুমের অভ্যাস তৈরি করা
- নিয়মিত শাকসবজি, ফলমূল ও পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া প্রয়োজন
- খাবার নেওয়ার আগে, একটু থেমে ভাবা জরুরি- আমার কি ক্ষুধা পেয়েছে, নাকি আমি শুধু হালকা কিছু খেতে চাইছি?
সতর্কবার্তা
মাঝে মাঝে দ্রুত ক্ষুধা লাগা স্বাভাবিক। তবে সুষম ও পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও যদি প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্ষুধা লাগে, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে বা ওজন দ্রুত কমতে শুরু করে, তবে এটি সুপ্ত কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এক্ষেত্রে বিলম্ব না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।