Friday, November 06, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চোখ বন্ধ করলেই গভীর ঘুম নাকি বিছানায় এপাশ-ওপাশ? যা বলছে বিজ্ঞান

মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার এই ক্ষমতার তারতম্য নির্ভর করে মূলত শরীর ও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

ঘুম মানবজীবনের এক অপরিহার্য ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও বিছানায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কারো চোখে গভীর ঘুম নেমে আসে, আবার কারও জন্য তা হয়ে ওঠে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা। বালিশে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ার বিষয়টিকে অনেকে সৌভাগ্য বা বিশেষ গুণ মনে করলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর শারীরিক ও জৈবিক কারণ। অন্যদিকে, বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ঘুমিয়ে পড়ার এই ক্ষমতার তারতম্য নির্ভর করে মূলত শরীর ও মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর।

মানবদেহের নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যা সার্কাডিয়ান রিদম নামে পরিচিত। এই ঘড়িটি মূলত নির্ধারিত করে কখন শরীর সজাগ থাকবে এবং কখন বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করবে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশে অবস্থিত ‘সুপারক্যাজম্যাটিক নিউক্লিয়াস’ নামের কোষগুচ্ছ এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে।

যাদের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক এবং পরিবেশের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাদের শরীর নির্ধারিত সময়ে মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) নিঃসরণ করে। ফলে সঠিক সময়ে তাদের দ্রুত ঘুম চলে আসে। পক্ষান্তরে, যাদের সার্কাডিয়ান রিদম কিছুটা ধীরগতির বা অনিয়মিত, তাদের মস্তিষ্ক ঘুমানোর সংকেত পেতে দীর্ঘ সময় নেয়।

ঘুমের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘স্লিপ প্রেশার’ বা ঘুমের চাপ। মানুষ সারাদিন যত বেশি সময় ধরে জেগে থাকে, মস্তিষ্কে ততই অ্যাডেনোসিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ জমতে থাকে। এই উপাদানটি জমে যাওয়ার ফলেই শরীরে ক্লান্তি অনুভূত হয় এবং ঘুমের চাপ তৈরি হয়।

যাঁরা দিনে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করেন বা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকেন, তাদের মস্তিষ্কে দ্রুত অ্যাডেনোসিন জমে। ফলে বিছানায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এর বিপরীতে, যারা সারাদিন কায়িক শ্রমহীন অলস জীবন কাটান বা দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে নেন, তাদের মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত ‘স্লিপ প্রেশার’ তৈরি হয় না। যার কারণে রাতে বিছানায় শুয়েও তাদের সহজে ঘুম আসতে চায় না।

ঘুমের এই পার্থক্যের পেছনে আধুনিক জীবনযাত্রার মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান সময়ে অনেকেরই রাতে দেরিতে ঘুমানোর অন্যতম বড় কারণ হলো ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহার। মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশনের নীল আলো (ব্লু লাইট) মস্তিষ্গকে ধোঁকা দিয়ে দিনের আলোর উপস্থিতি অনুভব করায়। এর ফলে শরীর মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা পায় এবং মস্তিষ্ক সজাগ থাকার সংকেত পেতে থাকে।

এছাড়াও, ঘুমের ক্ষেত্রে জিনগত বা বংশগত কারণও একটি বড় ভূমিকা পালন করে। অনেকের জন্মগতভাবেই স্নায়ুতন্ত্র এমন হয় যে তারা যেকোনো পরিবেশে দ্রুত মানসিক শান্তি খুঁজে পান এবং ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। আবার অনেকেই অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, কাজের চাপ বা উদ্বেগের কারণে রাতে মানসিক দিক থেকে শান্ত হতে পারেন না। মস্তিষ্কের অতিরিক্ত চিন্তার কারণে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন উচ্চমাত্রায় সক্রিয় থাকে, যা চটজলদি ঘুম আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, যাদের ঘুম আসতে দেরি হয়, তারা যদি নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলেন, শোবার ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখেন এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকেন, তবে ঘুমের এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।

   

About

Popular Links

x