জুলাই শহিদদের স্মরণে টরন্টো শহরে বিশেষ অনুষ্ঠান

ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রবিবার (৩ অগাস্ট) টরন্টোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজনে দিনব্যাপী এক স্মরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দিনের শুরু হয় টরন্টোর ড্যানফোর্থ এলাকায় শহিদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে, যেখানে কমিউনিটির সদস্যরা অভ্যুত্থানে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাহিদা সোবহান। তিনি বলেন, “জুলাইয়ের শহিদদের স্মরণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন উদ্যোগ জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। এই অনুষ্ঠান প্রমাণ করে যে মাতৃভূমির প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসা কতটা গভীর।”

ডানফোর্থ ও মেইন স্ট্রিট-এর হোপ ইউনাইটেড চার্চের মিলনায়তনে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান শুরু হয়। গ্রাফিতি, বই, ছবি ও পোস্টার প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন হাইকমিশনার নাহিদা সোবহান।  এমন প্রদর্শনীর আয়োজনের জন্যে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রদর্শিত পোস্টার  ও ছবি  আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল কিভাবে জীবন দিয়ে অসীম সাহসিকতায় আমাদের ছাত্র-জনতা গত বছর জুলাই আন্দোলনে বৈষম্যহীন নতুন এক গণত্রান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের আত্মত্যাগেই আমরা নতুন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি।’’

পোস্টার ও চিত্র প্রদর্শনী ছাড়াও জুলাই আন্দোলনে টরন্টোর অংশগ্রহণ নিয়ে ভিডিও ক্লিপস, প্রবাসি তরুণদের বিশেষ আলোচনা এবং দ্রোহের কবিতা ও গানসহ বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়।

গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে এবং গত মাসে মাইলস্টোন স্কুলের দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়।

অনুষ্ঠানের স্মারক হিসেবে একটি বিশেষ প্রকাশনাও প্রকাশিত হয়। আয়োজকদের পক্ষে  গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিকর্মী ইমামুল হক বলেন, ‘‘গত বছর কর্তৃত্ববাদী সরকার ও ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্বপক্ষে কানাডার নানান শহরে আমরা রাজপথে দাঁড়িয়ে ছিলাম, প্রতিবাদ করেছিলাম। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে টরন্টো শহর থেকে আমরা আবারও নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্নজাগানিয়া ‘জুলাই বিপ্লবের’ শহিদদের স্মরণ করছি।”

জুলাই শহিদদের স্মরণ করে প্রবাসী কমিউনিটির পক্ষে বাংলাদেশের ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকা বিশ্যবিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত সাবেক সহকারী সাধারণ সম্পাদক, টরন্টো প্রবাসী নাসির-উদ-দুজা অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান ছিল গণতন্ত্রহীন অপশাসনের বিরুদ্ধে সমগ্র জনগণের ঐক্যবদ্ধ বিস্ফোরণ। ছাত্র, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, কিশোরসহ ধর্ম নির্বিশেষে সবাই ছিলেন এর অংশীদার। বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেই আমরা হাজারও শহিদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে পারব। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে সমগ্র জনগণের মুক্তির লড়াইকে আমরা অব্যাহত রাখবো।’’

গত বছরের জুলাই-আগস্টে টরন্টো শহরেও বাংলাদেশি প্রবাসী তরুণরা রাজপথে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছিল। সেদিন শহরের রাজপথে প্রতিবাদে যারা সক্রিয় ছিল, এমন চারজন তরুণ প্রতিনিধি- সৃজনী, ফাতিন, মাহির এবং উপল অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কথা বলেন। আলোচনায় তারা বলেন, ‘‘প্রবাসে থাকলেও আমরা এমন এক বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক সাম্য, অন্তৰ্ভুক্তিমূলক সমাজ ও ন্যায্যতাই যেন হয় দেশ পরিচালনার মূল ভিত্তি।’’

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে  শহরের বিশিষ্ট শিল্পী শহিদ খন্দকার টুকু, আরিফ ফরহাত, নুসরাত জাহান, মামুন কায়সার, সুমন মালিকম, সৈয়দা মার্জিয়া আফরোজ,  কবি মেহরাব রহমান, শরীফ আহমেদ ফ্লোরা সূচি অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাহবুব ওসমানি। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মনির রাজু ‘‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদযাপন কমিটি, টরন্টোর’’ পক্ষ থেকে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘‘টরন্টোর ফ্যাসিবাদী শক্তির কিছু দোসরদের নানান অপপ্রচার ও অশুভ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণে টোরন্টোবাসী শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে আজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন। আশা করি আমরা আগামীতেও জুলাইয়ের চেতনায় উজ্জীবিত থাকবো।’’

জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।