তাই শুনে কেন মুসলমান-হিন্দু পিছেতে হটায়…

আধ্যাপক  আহমদ শরীফ সম্ভবত তার ৬০ কিংবা ৬৫তম জন্মদিনে নিজেই ব্যাপক আয়োজন করেছিলেন। সেদিন সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, গুনগ্রাহীদের কোলাহলে কেটেছে তার। শুভেচ্ছা গ্রহণ, আপ্যায়ন, আড্ডা আর ছবি তোলার মধ্য দিয়ে দিনের ব্যস্ত সময় পার করে তিনি যখন বিশ্রাম নিতে যাবেন, তখন আহমদ ছফা গিয়ে হাজির। ছফাকে দেখে অধ্যাপক শরীফ হাঁকডাক শুরু করলেন, "এই ছফার জন্য খাবার নিয়ে এসো, ক্যামেরা বের কর, আমি ছফার সাথে ছবি তুলব।" যেখানে অধ্যাপক আহমেদ শরীফের সাথে ছবি তুলতে পারলে অনেক প্রথিতযশা মানুষও নিজেকে ধন্য মনে করতেন, সেখানে তিনি নিজেই আহমদ ছফার সাথে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা বের করতে বলছেন! ছফা ভাবলেন, স্যারের মেজাজ মর্জি সত্যিই আজ বেশ ভালো। এই সময় লোকজনও বেশি নাই। ছফা বললেন, "স্যার যদি অভয় দ্যান, তাইলে একখান কথা কই।"

-"কও"

-"আপনি আর মৌলবাদীদের গালিগালাজ করবেন না। অন্ধকার দিয়ে অন্ধকার দূর করা যায় না। সেজন্য দরকার আলোর।"

-"তাইলে তুমি আমারে কি করতে কও?'

-"আপনি দেশের সবগুলি বামপন্থী দলকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।"

গত কয়েকদিন ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া অঞ্চলের কয়েকজন গরু ব্যবসায়ীকে একদল উন্মত্ত জনতার নিগ্রহের ভিডিও খুব স্বল্পপরিসরে হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ শেয়ার করেছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, মুসলমানদের শুয়োরের মাংস খাওয়া হারাম, বাংলাদেশের মাঠেঘাটে শুয়োর চরে বেড়ায়। চরম প্রতিক্রিয়াশীল একজন মুসলমানও তো কখনও শুয়োরের পালের মালিককে কখনও হেনস্থা করেন নাই। কথা সত্য। আমরা ছোটবেলা থেকে আমাদের গ্রামে দেখেছি কয়েকজন মানুষ মিলে অনেক শুয়োর নিয়ে চরাতে আসতেন। গ্রামের পাশে একটু উঁচু জায়গাতে আস্তানা গাড়তেন। আমরা হিন্দু-মুসলিম ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই আস্তানা দেখতে যেতাম। কিন্তু তাদের ওপর হামলা হতে পারে এই শংকা কখনও ছিল কি? তবে যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তারা হয়ত ভিডিওটার শেষের স্লোগানটা শোনেন নাই কিংবা শুনলেও বুঝতে পারেন নাই, ওইটা কাদের স্লোগান। জয় শ্রীরাম হো বিজেপির স্লোগান। কাজেই এইটার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের গোটা হিন্দু সম্প্রদায়কে যেমন দায়ী করা যায় না, তেমনি বাংলাদেশে ভিন্ন ধর্মের মানুষের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ে হামলা, ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশের কথিত সংখ্যাগরিষ্ঠ  সম্প্রদায়ের সকল মানুষকে দায়ী করা যায় না। তাহলে দায়ী কে? দায়ী হল, রাষ্ট্র, দায়ী হলো রাজনীতি। 

ছফা-শরীফের গল্পের সাথে এই ঘটনার সম্পর্ক কি? সম্পর্ক তো আছেই। আমি আমার ছোটবেলাতে চিকিৎসার জন্য কয়েকবার ভারতে গিয়েছিলাম, ভারত বলতে কোলকাতাতে। কিন্তু আমি থাকতাম সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে নয়, গাইঘাটা-ঠাকুরনগর এলাকাতে। গাইঘাটা থানা শহর থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে একটা গ্রাম আছে, সেই গ্রামের শেষ প্রান্তে একটা বাড়ি ছিল। মূল গ্রাম থেকে দুই/তিনশ গজ দূরে সেই বাড়িটা একজন হাজী সাহেবের বাড়ি। আমার সমবয়সী আমাদের আত্মীয় একটি ছেলে একদিন আমাকে বলল, দেখেছিস বাড়িটা কত সুন্দর জায়গায়। একদিন রাতের বেলা একটা খেলনা পিস্তল এনে হাজী সাহেবকে ভয় দেখিয়ে বাড়িটা দখল করে নিতে হবে। আমি শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। এর পরের বার যখন ভারতে গিয়েছি, তখন আমাদের গ্রামেরই একজন লোক যিনি মূলত শ্রমজীবী মানুষ কিন্ত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গানবাজনা করতেন। ভারতে যাবার পর তারা নানা জায়গা থেকে  আসরে গান গাইবার জন্য ডাক পেতে শুরু করেন। তাই নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে পরিবারের সবাই মিলে ভোর বেলাতে চর্চা শুরু করেন। গিয়ে শুনি সেই পরিবার প্রধান সত্যেন জ্যাঠাকে গাইঘাটা থানায় ডেকে বলা হয়েছে, আপনি ভোরবেলা বাদ দিয়ে অন্য সময় চর্চা করবেন। কেন জানতে চাইলে তাকে যেটা বলা হয়েছে, ওই সময় হাজী সাহেব নামায পড়েন। উনার নামাযে বিঘ্ন ঘটে। বোঝা গেল ব্যাপারটা? একটি বাচ্চা ছেলে যার বাড়ি দখলের স্বপ্ন দেখছে, রাষ্ট্র তাকে কিভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে সেটা এই ঘটনা থেকেই আমরা বুঝতে পারি। কারণ তখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল। 

বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে সারা ভারতজুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, তখন পশ্চিমবঙ্গে সেই অর্থে কোনো দাঙ্গা হয়নি। সাংবাদিকরা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে এটা কীভাবে সম্ভব হলো জিজ্ঞাসা করাতে উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমাদের রাজ্যে সরকার চায়নি, তাই দাঙ্গা হয়নি। এখন ভারতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন, তারা উদাসীন বলেই কিংবা সরাসরি বললে তারা চান বলেই, এই ধরনের নিগ্রহের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে ঘটানো সম্ভব  হচ্ছে। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গে তো তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায়। মুসলিম  সম্প্রদায়ের বৃহদাংশের ভোটে জিতেই তৃণমূল ক্ষমতায়। তাহলে? তৃণমূলের অবস্থা খানিকটা দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে বাংলাদেশের আওয়ামলীগের মত। ১/১১ পরবর্তী আওয়ামলীগের দীর্ঘ শাসনামলে কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ভিন্ন ধর্মের মানুষের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের একটি ঘটনারও বিচার হয়েছে? এগুলির সাথে জড়িত একজন মানুষেরও দৃষ্টান্তমূলক কি  শাস্তি হয়েছে? অথচ এদেশের ভিন্নধর্মের মানুষকে বিবেচনা করা হয় আওয়ামলীগের রিজার্ভ ভোট হিসাবে। তবুও বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে বিজেপি’র মত চরম উগ্র সাম্প্রদায়িক দল অদ্যাবধি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে নাই। ভারতে গরু ব্যবসায়ীদের  নিগ্রহের ঘটনায় যে অল্প কয়েকজন মানুষের বক্তব্য আমার নজরে এসেছে, তাদের একজন আমার সরাসরি শিক্ষক, তিনি কিছুদিন আগে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্যের পিতার নির্দেশে একজন ভিন্ন ধর্মের নারী শিক্ষককে নিগ্রহের ঘটনার ভিডিও ক্লিপিংসও শেয়ার করেছেন। তার মানে বাংলাদেশে একজন ভিন্ন ধর্মের মানুষ কিংবা নাগরিক নিগৃহীত হলে তিনি যেমন ব্যথিত হন, ভারতে হলে,  কিংবা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে হলেও তিনি ব্যথিত হন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্ত সংকটটা হলো, আমরা আমাদের রাষ্ট্রাচার, সামাজিক আচারেও ধর্মীয় আচারকে টেনে আনাকে এখন চর্চায় পরিণত করে ফেলেছি। ধর্ম যে নিতান্তই ব্যক্তিগত চর্চার বিষয় সেইটা নিশ্চিত হলে এবং রাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং তোষণমুক্ত হলেই সমাজে এই ধরনের নিগ্রহের ঘটনা ঘটবে না এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এবং সেটা বোঝার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা’র উদহারণ টানার দরকার নেই, এই লেখায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক ঘটনা আমি উল্লেখ করেছি। 

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে বামপন্থী রাজনীতিই কি একমাত্র সমাধান? সমাধান কি সমাধান না সেটা তো আমরা ২৪ এর কথিত গণ-অভ্যূত্থানের পর এক বছরের বাংলাদেশের চিত্র দেখলেই বুঝতে পারি। নবযাত্রার আগে কমপক্ষে জানতে হয়, আমরা কোথা থেকে এসেছি এবং কোথায় যেতে চাই। বাঙ্গালির হাজার বছরের ইতিহাস বাদ দিলাম, যে প্রজন্ম এই অভ্যূত্থানের মূল কৃতিত্বের দাবীদার তারা একাংশ আমাদের মাত্র অর্ধশত বছর আগের গৌরবের ইতিহাস, রাষ্ট্র হিসাবে আমাদের জন্মলগ্নকে অস্বীকার করছে। যারা এই দেশের স্বাধীনতা চায়নি, তাদেরকে হিরো বানাতে চাইছে। আর এইসব তারা  ধর্ম, একটি বিশেষ ধর্মকে আশ্রয় করে  করতে চাইছে। যখন কোনো দেশে একটি ধর্মের মানুষেরা কিংবা কোনো বিশেষ ধর্মমতের অনুসারীরা প্রাধান্য পাবে, তখন সমাজে এবং রাষ্ট্রে তারাই প্রভাবক শক্তি হয়ে উঠবে এবং নিপীড়নের ঘটনায় রাষ্ট্র এবং রাজনীতও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হবে। তাই বামপন্থী রাজনীতি আপনার, আমার পছন্দের না হলেও সেক্যুলার রাজনীতি যে অপরিহার্য সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণের কোনো সুযোগ নেই। লালন বলে গেছেন, শুকর গরু দুইটি পশু, খাইতে বলেছেন যিশু, তাই শুনে ক্যান মুসলমান-হিন্দু পিছেতে হটায়…সেক্যুলার রাজনীতির ভাষ্য হল, যার খাইতে ইচ্ছে করবে, সেই দুইটাই খাবে, যার করবে না, সে কোনোটাই খাবে না , কিংবা একটা খাবে, অন্যটা খাবে না কিন্তু কে কোনটা খেল কিংবা কে কোনটা খেল না, সেইটা রাষ্ট্র নজরদারি করবে না এমনকি সমাজ করতে গেলেও রাষ্ট্র সেইটা বরদাস্ত করবে না বরং রাষ্ট্রের মূল কাজ কাজ হল, সকল মানুষ খেতে পেল কি’না, নিরাপদে ঘুমাতে পারল কি’না, অসুস্থ হলে আরোগ্র্য সেবা নিশ্চিত হল কি’না, সমাজে চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হল কি’না, প্রত্যেকটি শিশুর-কিশোর-কিশোরীর বুনিয়াদি শিক্ষা নিশ্চিত হল কি’না সেগুলি দেখা এবং সমাজকে, সমাজের মানুষকে এইসব কাজের সাথে যুক্ত করা। শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে, দেশে কিংবা দেশের বাইরে আমরা যদি কোনো নিগ্রহের চিত্র না দেখতে  চাই, তাহলে আর পিছু হটার রাস্তা নেই। সেক্যুলার রাজনীতির পথেই আমাদের হাঁটা শুরু করতে হবে, আজই, এখনই!  

মানবাধিকার কর্মী অপূর্ব দাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মানবাধিকার, নারী অধিকার, জেন্ডার এবং নারীর ভূমি অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে। এছাড়াও যুক্ত আছেন লেখালেখি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।