রাজনীতি ও দুর্নীতি: প্রবাসী সংগঠনগুলো কি হারাচ্ছে মূল লক্ষ্য?

প্রবাসী জীবনের মানে কখনো সরল নয়। দূরের মাটিতে দাঁড়িয়ে, শহরের ভিড়ে প্রতিটি মানুষ যেন নিজের ছোট্ট এক যুদ্ধের মধ্যে লিপ্ত থাকে। প্রতিদিন এক নতুন দিনের সঙ্গে লড়াই, সকাল থেকে ঘুম ভেঙে দিনের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়—আজও শুধু কাজ, শুধু হিসাব-নিকাশ, শুধু পরিবারকে মনে করার ব্যথা। হাসি নেই, আনন্দ নেই। প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো সময় যেন শুধু স্মৃতির পটভূমি হয়ে থাকে।

এই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করতে প্রবাসীরা গড়ে তোলে কমিউনিটি এবং অ্যাসোসিয়েশন। বিশেষ দিবস, পহেলা বৈশাখ, ঈদ বা দুর্ঘটনার সময়—সবকিছুতেই এই সংগঠনগুলো প্রবাসীর পাশে থাকে। তাদের চোখে, এগুলো যেন এক ধরনের ছোট্ট বিশ্ব, যেখানে কেউ একা নয়।

প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা এই সংগঠনগুলো গড়ে তুলেছিলেন সেবার জন্য, সহযোগিতার জন্য, এবং প্রবাসী সমাজের মধ্যে ঐক্য রক্ষার জন্য। তারা চেয়েছিলেন এমন একটি জায়গা, যেখানে সবাই একসাথে আনন্দ ভাগাভাগি করবে, যেখানে কেউ কষ্টের দিনে একা থাকবে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। কিছু সংগঠন এখন কেবল নামের জন্য, যেখানে সাধারণ প্রবাসী নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা নেই। এখানে প্রকৃত সাহায্যের পরিবর্তে চলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা বা রাজনৈতিক দলের প্রভাব ধরে রাখার লড়াই। বিশেষ দিবস বা উৎসবের আয়োজন হয় যেন দেখানোর জন্য, প্রকৃত প্রয়োজনে সাহায্য আসে না।

নেতৃত্বের লড়াই ধীরে ধীরে সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যিনি ক্ষমতাশালী, তার কথাই সবকিছুর উপরে চলে। সাধারণ প্রবাসীর কণ্ঠস্বর প্রায় শুনতে পাওয়া যায় না। কেউ সাহায্য চায়, দেখা যায় কাগজে সভা-সমিতি, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর কিছু হয় না। নামের জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, কিন্তু প্রকৃত সহযোগিতা আসে না। এতে প্রবাসীর আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমে যায়।

অর্থ ব্যবস্থাপনাও জটিল

তহবিল আসে, অনুদান আসে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে বা কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে—স্বচ্ছতা নেই। একজন প্রবাসীর অসুস্থ সন্তান বা বিপদগ্রস্ত পরিবার—সেখানে সাহায্য পাওয়া কঠিন। প্রকল্প কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ। এতে প্রবাসীর মধ্যে হতাশা বেড়ে যায়, আস্থা ক্ষুণ্ণ হয় এবং সংগঠনের মূল উদ্দেশ্যকে আঘাত লাগে।

রাজনীতির প্রভাব প্রবল

বাংলাদেশের দলগুলোর ছোঁয়া প্রবাসী সংগঠনগুলোতে স্পষ্ট। একেকটি অ্যাসোসিয়েশন একেক দলের ও অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে সাধারণ প্রবাসীরা বিভক্ত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়, মানুষ উপেক্ষিত হয়। রাজনীতি এবং স্বার্থপরতার কারণে মূল উদ্দেশ্য—সেবা ও সহায়তা—পিছনে পড়ে।

একটি ছোট অ্যাসোসিয়েশনের উদাহরণ নিই। সেখানে প্রায় সকল প্রবাসী একে অপরকে চেনে। কিন্তু নতুন প্রকল্প নেওয়ার সময় দেখা যায়, তহবিল নিয়ে নেতা ও তার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। প্রকল্পের টাকা হয় অপব্যবহৃত। সাহায্য প্রয়োজন হলে সাধারণ প্রবাসীর হাতে কিছু আসে না। তরুণরা এই দৃশ্য দেখে অংশগ্রহণ থেকে সরে যায়।

প্রবাসীর মানসিক চাপও অপরিসীম

একাকিত্ব, পরিবারের দূরত্ব, সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা—এসব মনকে ভেঙে দিতে পারে। অনেকে বিষণ্নতা এবং নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই করছে। তবুও তারা চুপচাপ থাকে, “সব ঠিক আছে” বলে। প্রতিদিনের সংগ্রাম, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা—এসব তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তরুণ প্রজন্মের হতাশা আরও উদ্বেগজনক

তারা দেখছে স্বার্থপর নেতৃত্ব, ক্ষমতার লড়াই ও রাজনৈতিক প্রভাব। প্রকৃত সেবা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন স্থবির। তাই তারা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ হারাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে প্রবাসী সমাজের ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে।

সাংস্কৃতিক সংরক্ষণও আজ বড় চ্যালেঞ্জ

প্রবাসীরা চায় দেশীয় উৎসব ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে। কিন্তু স্বার্থপর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং অর্থের অপব্যবহার এই প্রচেষ্টা ব্যাহত করছে। নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা প্রবাসী সমাজের আত্মপরিচয়কে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সংগঠনগুলোতে স্বচ্ছতা না থাকায় অনেক প্রবাসী মনে করে সাহায্য বা প্রকল্প কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ। দুর্ঘটনার সময়, অসুস্থতার সময়, আর্থিক সংকটে—সবার জন্য প্রাপ্তি অসম। এতে প্রবাসীর মধ্যে হতাশা, আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়, এবং সংগঠনগুলো প্রবাসীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয়ে ওঠে।

সমাধান অসম্ভব নয়

স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করলে প্রবাসী সংগঠনগুলো পুনরুজ্জীবিত হতে পারে। প্রকল্প, তহবিল ও কার্যক্রম সম্পর্কে সকলকে খোলামেলা জানানো উচিত। রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থপরতাকে দূরে রাখলে সংগঠনগুলো প্রকৃত সেবামূলক হিসেবে কাজ করতে পারবে। সাধারণ প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে নতুন শক্তি ও নতুন ভাবনা যোগ করার সুযোগ দিতে হবে।

প্রবাসী সংগঠনগুলো শুধুমাত্র নামের জন্য নয়, বাস্তব জীবনের সাহায্য এবং সামাজিক ঐক্য নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক দিকনির্দেশনা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব থাকলে প্রবাসী কমিউনিটি আবারও প্রবাসীদের জীবনকে অর্থপূর্ণ, মানসিকভাবে সুরক্ষিত এবং আত্মবিশ্বাসী করতে পারবে।

প্রবাসীরা জানে, সংগ্রাম সহজ নয়। তবে তারা কখনো হাল ছাড়ে না। তাদের স্বপ্ন এবং সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, সঠিক নেতৃত্ব ও দায়বদ্ধতা থাকলেই প্রবাসী সমাজ আবারও দৃঢ়, একত্রিত এবং শক্তিশালী হতে পারে। আমাদের দায়িত্ব হলো এই পরিবর্তনের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, যাতে প্রতিটি প্রবাসী আশ্রয়, সহায়তা এবং সম্মান পেতে পারে।

সজীব খান, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী, লিসবন, পর্তুগাল ।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।