Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রবাসীর চোখে: ট্রাম্পের আমলে নতুন এক বাস্তবতা

আমেরিকা ও ইউরোপে অভিবাসন নীতির কঠোরতা প্রবাসীদের জন্য নতুন এক বাস্তবতা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৩৬ পিএম

প্রবাসীরা বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যাদের অবদান দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তারা দেশের বাইরে গিয়ে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করে, অন্যদিকে তারা তাদের পরিবার এবং দেশের জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করে। কিন্তু এখন, বিশ্বের বৃহত্তম প্রবাসী গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম আমেরিকা ও ইউরোপে অভিবাসন নীতির কঠোরতার কারণে বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি অভিবাসী ও তাদের প্রজন্মের সংখ্যা বেড়েছে, তবে এই প্রবাসী শক্তি এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমেরিকা ও ইউরোপের অভিবাসন নীতি দ্রুত আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। একসময় যেখানে প্রবাসীরা বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং কাজ করতে পারত, এখন তাদের জন্য সেই পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে, আমেরিকার অভিবাসন নীতি, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে অনেকাংশে পরিবর্তিত হয়েছে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য এক বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর, তার প্রশাসন কম দক্ষ কর্মীদের জন্য কাজের ভিসা সীমিত করার পরিকল্পনা করছে। এটি সরাসরি প্রভাব ফেলবে তাদের উপর, যাদের কোনো বিশেষ দক্ষতা নেই কিন্তু যারা নানা ধরনের শ্রমিক হিসেবে আমেরিকায় কাজ করে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে অংশ নিচ্ছেন। আগের দিনে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ভরসা ছিল, কিন্তু যদি এই প্রবাহে হ্রাস আসে, তাহলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এছাড়া, গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া খুব শিগগিরি কঠোর হতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন তার নীতি আরও কড়া করার পরিকল্পনা করছে। আমেরিকায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে "ম্যাস ডিপোর্টেশন" বা গণ-নির্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে, ফলে যেসব বাংলাদেশি আমেরিকায় অবৈধভাবে বসবাস করছেন, তারা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। ট্রাম্পের প্রশাসন সম্ভবত বিদেশে পাঠানো অর্থের ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা করবে, যা সরাসরি বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে যারা বিদেশে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠান, তাদের ওপরও চাপ বাড়বে।

ইউরোপের পরিস্থিতি অবশ্য এর থেকে কোনো অবস্থাতেই সহজ নয়। ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে বাংলাদেশের অভিবাসী সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে, ইউরোপীয় দেশগুলোও তাদের অভিবাসন নীতি কঠোর করেছে। এই দেশগুলোতে বাংলাদেশের কম দক্ষ কর্মীদের জন্য প্রবেশের শর্ত কঠিন হয়েছে এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ কমে গেছে। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য আরও কঠোর নিয়ম চালু করেছে, যার ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকরা সেই দেশে স্থায়ী হতে অনেক বেশি অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন। ইতালি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে প্রবাসীদের জন্য শ্রমবাজার সংকুচিত হতে চলেছে, এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এই পরিবর্তনগুলোর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য নতুন কিছু সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, কিন্তু তা সীমিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই হাজার হাজার বাংলাদেশি অবৈধ পথে প্রবেশের চেষ্টা করছে, যে কারণে মানবপাচারের চক্র আরও বেড়েছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, তবুও তাদের স্বপ্ন চূড়ান্তভাবে শেষ হচ্ছে না। তারা এখনও আশায় রয়েছে, জীবনের চরম অনিশ্চয়তায়ও ইউরোপে একটি স্থায়ী আশ্রয় পেতে, যাতে তাদের পরিবারের জন্য একটি ভালো জীবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়।

এই অভিবাসন নীতির পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ। এই রেমিট্যান্স যদি কমে যায়, তাহলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে। দেশের অর্থনীতির যে প্রবাহ এখন বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে আসে, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। টাকা পাঠানোর সুযোগ কমে গেলে দেশের মুদ্রার মান আরও দুর্বল হতে পারে, এবং বিদেশের উপর আমাদের নির্ভরতা আরও বাড়বে।

তবে, বাংলাদেশ সরকার যদি এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে একটি বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে। বিশেষ করে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের মাধ্যমে যদি প্রবাসীদের জন্য আইনি সহায়তা এবং কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করা যায়, তবে বিদেশে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সরকার এই সংকট মোকাবিলা করতে কতটা প্রস্তুত? ট্রাম্পের কঠোর নীতি, ইউরোপের অভিবাসন আইন—এই সব বাধা পেরিয়ে প্রবাসীরা কীভাবে টিকে থাকতে পারবেন? সরকার কি প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নতুন বাজার তৈরির জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে? বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনে এখন যে পরিবর্তন আসছে, তা দেশের অর্থনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? এইসব প্রশ্নের উত্তর শুধু আমাদের আজকের সিদ্ধান্তে নিহিত রয়েছে ।

সজীব খান, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী, লিসবন, পর্তুগাল ।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x