এবারের বাজেট কতোটুকু বাস্তবমুখী, স্বাস্থ্যখাতে প্রত্যাশা কতোটুকু পূরণ করবে?

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর একটি বিস্তারিত ও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো। এই বিশ্লেষণটি বাজেটের বরাদ্দ, বাস্তবমুখিতা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের সক্ষমতার ওপর আলোকপাত করে।

২০২৬ সালের স্বাস্থ্য বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বরাদ্দ বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এক দশকে (২০১৫-২০২৫) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে ২০১৭, ২০২০ এবং ২০২৪ সালে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে । তবে এই প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও, স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত জাতীয় বাজেটের ১৫% বরাদ্দের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫% এর কাছাকাছি সীমাবদ্ধ থেকেছে (যেমন: ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫.৬৩% প্রস্তাবিত বাজেট), যা স্বাস্থ্য খাতের বর্ধিত চাহিদা ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় নগণ্য।

বাজেটের কাঠামোগত বিন্যাস ও উপ-খাতভিত্তিক বরাদ্দ

স্বাস্থ্য বাজেটের অর্থায়ন মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত-রাজস্ব বাজেট এবং উন্নয়ন বাজেট। বিদ্যমান তথ্য অনুযায়ী, সরকার স্বাস্থ্যখাতের রাজস্ব বাজেটের ৬১% এবং উন্নয়ন বাজেটের ১৫% জোগান দেয়, যেখানে বাজেটের ২৪% আসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বিশেষায়িত উপ-খাতগুলোর মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় পরিবার পরিকল্পনা মাঠ পর্যায়ে সেবা প্রদানের জন্য ৭% এবং ক্লিনিক্যাল গর্ভনিরোধক সেবা প্রদানের জন্য ৬% বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

বাজেটের বাস্তবমুখিতা ও প্রয়োগযোগ্যতা যাচাই

২০২৬ সালের স্বাস্থ্য বাজেটের বাস্তবমুখিতা কেবল এর মোট বরাদ্দের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এই বরাদ্দ মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে ব্যয় করার প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করতে গিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সামনে আসে:

১. প্রশাসনিক সক্ষমতা ও বাস্তবায়নগত বাধা

স্বাস্থ্যসেবা অর্থায়ন কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার দুর্বলতা। জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের আর্থিক ক্ষমতার অভাব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, এবং মাঠ পর্যায়ে জরুরি পরিচালন তহবিলের অপ্রতুলতা বাজেট বাস্তবায়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। অডিট আপত্তির প্রতি অনীহা এবং সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য আইনি কাঠামোর অভাব এই বাস্তবমুখিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

২. ঐতিহাসিক বাজেট ব্যবহারের ধারাবাহিকতা ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো অব্যবহৃত তহবিলের উচ্চ হার। বিগত সাত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তার বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৭৬% ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবমুখিতা নির্ভর করছে “ফিসকাল স্পেস” বা বাজেটিয় অবকাশ তৈরির ওপর। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় মোট সরকারি ব্যয়ের অনুপাতে ৬.২% থেকে কমে ৪.০৪%-এ নেমে আসা এবং জিডিপির ১%-এর কম বরাদ্দ হওয়ার প্রবণতা বাজেটটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।

স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং বাজেটিয় সক্ষমতা

স্বাস্থ্যখাতের প্রধান বাধাগুলো মোকাবিলায় ২০২৬ সালের বাজেট কতটা কার্যকর হবে, তা পর্যালোচনায় কাঠামোগত অদক্ষতা এবং অপর্যাপ্ত বরাদ্দের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

•    উচ্চ ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার মোট খরচের ৬৭% রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়, যা বিশ্বব্যাপী অন্যতম সর্বোচ্চ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই উচ্চ ব্যয়ের প্রধান কারণ হলো ওষুধের উচ্চমূল্য (৬১.৩৮%) এবং চিকিৎসকের ফি (১৩.৩৮%)।

•    জনবল ও অবকাঠামো সংকট: স্বাস্থ্য খাতের মঞ্জুরিকৃত পদের প্রায় ৩৪% বর্তমানে শূন্য রয়েছে, যা প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, প্রতি ১,৬৬৭ জনের বিপরীতে মাত্র একটি হাসপাতাল শয্যার স্বল্পতা স্বাস্থ্যসেবার মানকে ব্যাহত করছে।

•    প্রযুক্তিগত ঘাটতি: সরকারি হাসপাতালগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগের অভাব রয়েছে, যার ফলে রোগীরা ব্যয়বহুল বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন । বিশেষ করে অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসার অভাব দূর করার জন্য বাজেটে যে কৌশলগত বিনিয়োগের প্রয়োজন, তা এখনো সীমিত।

জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সম্ভাব্য ব্যবধান: ইউএইচসি ২০৩০ অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা

সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, উচ্চমাত্রার চিকিৎসা ব্যয় প্রতি বছর প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে । ২০২৬ সালের বাজেট সংখ্যাগতভাবে বৃদ্ধি পেলেও জনগণের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

 

ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ ২০৩০ অর্জনের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশ ২০৩২ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে বাজেটের ১৫% বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ অর্জনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায়, স্বাস্থ্যখাতে সরকারের ব্যয় মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের মাত্র ২৩%, যা লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা। গবেষণামূলক পূর্বাভাস বলছে, বর্তমান ধারা বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার ৮০% কাভারেজ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হতে পারে। 

ইউএনইচসি অর্জনের পথে প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো হলো:

•    প্রি-পেমেন্ট ব্যবস্থার অভাব: স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রি-পেমেন্ট বা রিস্ক পুলিং মেকানিজমের অভাব রয়েছে। সরকারিভাবে পাইলট প্রকল্প হিসেবে “স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি” চালু হলেও, তা এখনো দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়নি।

•    সেবার গুণগত মান ও নজরদারি: মাধ্যমিক ও উচ্চতর পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার মান মনিটরিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট সূচক বাজেট কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত নেই ।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের স্বাস্থ্য বাজেট তখনই বাস্তবমুখী হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে যখন কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কার, পকেটের খরচ হ্রাস এবং বাজেটের অর্থ ব্যবহারের পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে।

 

 ডা. আমিনুর রহমান শাহীন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।