আমরা সাধারণত ম্যালেরিয়াকে শুধুমাত্র আর্দ্র ও উষ্ণ দেশগুলোর জন্য সমস্যা হিসেবে মনে করি। কিন্তু মাত্র এক শতাব্দী আগেও এই রোগটি সাইবেরিয়া এবং আর্কটিক সার্কেল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি রাজ্যেও এটি স্থানীয় রোগ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও রোগটির প্রার্দুভাব ছিল, তবে দেশটিতে ম্যালেরিয়ার ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে নেই। সেই সময়ে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিবছর ম্যালেরিয়ায় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে অনুমান করা হয়।
উন্নত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ১৯৫০ এর দশকে বাসস্থান, ওষুধ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির মাধ্যমে ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে সক্ষম হয়। মানুষ বিত্তবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মশার প্রজনন স্থল ও জলাভূমি কমতে থাকে। একইসঙ্গে বাড়তে থাকে পশুসম্পদ, যার ফলে মানুষের পরিবর্তে এসব প্রাণীদের কামড়ানোর সুযোগ বাড়ে মশাদের। আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উন্নত বাসস্থান এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগ বেড়েছে, যা পোকমাকড়ের হাত থেকে মানুষের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে। কুইনাইন এবং সিন্থেটিক ক্লোরোকুইন উন্নত দেশগুলোতে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা সাশ্রয়ী করেছে। এছাড়া, কীটনাশক মশার প্রজনন বাধাগ্রস্ত করেছে।
সাব-সাহারান আফ্রিকার বাইরে ম্যালেরিয়ায় বার্ষিক মৃত্যু ১৯৩০ সালের ৩০ লাখ থেকে কমে বর্তমানে ত্রিশ হাজারেরও কমে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া এখনও বেশ দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে, এই অঞ্চলে এখনও প্রতিবছর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মশাবাহিত রোগটিতে প্রাণ হারায়।
এর পেছনে বিশেষজ্ঞরা দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, আফ্রিকায় পাওয়া ম্যালেরিয়া পরজীবীটি সবচেয়ে মারাত্মক এবং স্ট্রেনগুলো সাধারণ ওষুধ ক্লোরোকুইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকায় ম্যালেরিয়াবাহী মশারা মানুষকে বিনা বাধায় কামড়ায়। ২০০০ এর দশকের শুরুতে আফ্রিকায় ম্যালেরিয়ার মোকাবিলায় বেশ অগ্রগতি হয়েছিল, তবে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে এ সংক্রান্ত ওষুধের সরবারহ কমে যাওয়ায় সে অগ্রগতি ধরে রাখা যায়নি।
ম্যালেরিয়া থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বনেতারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৫৫ সালে বৈশ্বিক ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি নেওয়া হলেও ১৯৬৯ সালে তা স্থগিত করা হয়। ২০১৫ সালে বিশ্বেনেতারা আবারও এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঐক্যমত্যে পৌঁছান। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের যে প্রতিশ্রুতি বিশ্বনেতারা দিয়েছেন, সেখানে অন্যান্য অনেক বিষয়ের সঙ্গে ম্যালেরিয়া নির্মূলের বিষয়টিও রয়েছে।
তবে দুঃখের বিষয় হলো, ম্যালেরিয়া নিমূর্লে কার্যকরী উদ্যোগের বিষয়টি কার্যত হিমাগারেই রয়ে গেছে। এভাবে চললে এই লক্ষ্য অর্জনে আরও ৪০০ বছর লেগে যাবে। এটি মূলত এসডিজির আরও অনেক ব্যর্থ লক্ষ্যমাত্রার একটি উদাহরণ মাত্র। এর মূল কারণ, এসডিজিতে বিশ্বনেতারা অনেকে বেশি বিষয় যুক্ত করেছেন। এসডিজিতে মোট ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এতো বেশি বিষয়ের অন্তর্ভূক্তির অর্থ হলো, কোনো বিশেষ বিষয়ে অগ্রাধিকার না থাকা।
এই বছর আমরা এসডিজির অর্ধেক সময় পার করছি, তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অর্ধেকের থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে আমরা। তাই কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে সেটি নির্ধারণ করা এখন সবচেয়ে জরুরি। এই পরিস্থিতিতে কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা নির্দিষ্টকরণের জন্য বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রিমা শ্রেট্টা এবং র্যান্ডলফ এনগওয়াফোর আফ্রিকার ম্যালেরিয়া আধিক্যপূর্ণ ২৯টি দেশে কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার নিশ্চিতকরণের সুপারিশ করেছেন।
সুরক্ষিত বিছানায় ঘুমানো ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি। কীটনাশকযুক্ত মশারির সংস্পর্শে মশার মৃত্যু ঘটে। এই ধরনের প্রতিটি মশারির দাম চার ডলারেরও কম, সবচেয়ে বড় কথা হলো এই মশারির কারণে মশার প্রজনন হ্রাস পায়।
এই ধরনের মশারি বিতরণের পাশাপাশি এর ব্যবহারবিধি ও অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে সরবরাহ করা গেলে ম্যালেরিয়াবাহী মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।এজন্য বার্ষিক খরচ হবে প্রায় ১.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বার্ষিক লিপস্টিকের ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ।
এই বিনিয়োগ ২০২৩ সালের বাকি সময়েও ত্রিশ হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে৷ এর ফলে এই দশকের শেষ নাগাদ ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেক নেমে আসবে, অর্থাৎ এই সময়ে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যাবে।
কীটনাশকযুক্ত মশারির ব্যবহার ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ কমায়। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এই মশারির ব্যবহার ২০৩০ সালের মধ্যে ২৪২ মিলিয়ন মানুষের অসুস্থতা ঠেকাবে। যার ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার অর্থ হলো- প্রাপ্তবয়স্করা কাজে যেতে পারবে, শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে পারবে। যার ফলে যেকোনো দেশের মোট উত্পাদনশীলতা বাড়বে।
সবমিলিয়ে এই খাতে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৪৮ ডলারে সামাজিক সুবিধা আসবে। যা অত্যন্ত লাভজনক।
আমরা ম্যালেরিয়াকে আফ্রিকায় দারিদ্র্যের রোগে পরিণত হতে দিয়েছি। যখন আমরা এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছি তখন আমাদের সবচেয়ে স্মার্ট জিনিসগুলো সরবরাহ করা উচিত। কীটনাশকযুক্ত মশারির পেছনে এই ব্যয় ১৩ লাখ মানুষের জীবন বাঁচাবে।
ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।
এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-
- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব
- এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব
- শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে
-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে
-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান
-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি
-এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে



