Thursday, May 30, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এসডিজি অর্জনে অপুষ্টি মোকাবিলায় আর বেশি জোর দিতে হবে

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য ড. বিওন লম্বোগের লেখা এই বিশেষ নিবন্ধে দেখানো হয়েছে স্মার্ট পলিসিতে বিনিয়োগ কীভাবে এসডিজি অর্জনে সহায়ক হতে পারে

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৩, ০২:২৫ পিএম

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্ব এখনও বেশকিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে পিছিয়ে আছে। এর মধ্যে অপুষ্টি সমস্যার মোকাবিলা অন্যতম। তবে আশার কথা এই যে, ক্ষুধা দূরীকরণ বিশ্বনেতাদের বিশেষ নজরে রয়েছে।

আমরা সাধরাণত সমবয়সীদের সঙ্গে শিশুদের আকৃতির তুলনা করে তাদের অপুষ্টির বিষয়টি নিরুপণ করে থাকি।

সাম্প্রতিক সময়ে ধনী দেশগুলো খর্বাকৃতির সমস্যা খুব সামান্য পরিমাণে হ্রাস করতে পেরেছে, যদিও গত ৩০ বছরে ধনী দেশগুলোর তুলনায় চীন এক্ষেত্রে বেশি অগ্রগতি করেছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে খর্বাকৃতির সমস্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে, তারপরও বিশ্বব্যাপী প্রতি পাঁচজনে একজন শিশু এখনও খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান, ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে পাঁচ বয়সের কমবয়সী শিশুদের ২৮% খর্বাকৃতির সমস্যায় আক্রান্ত। 

খর্বাকৃতির সমস্যা শিশুদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমায়, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ২৭ লাখ শিশু অপুষ্টিতে মারা যায়। খর্বাকৃতির শিশুদের মানসিক বিকাশ কম হয়, কম আয়ুষ্কালের পাশাপাশি তাদের উৎপাদনশীলতাও কম। অর্থনীতিবিদদের অনুমান, অপুষ্টির কারণে বার্ষিক বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অর্ধেকের বেশি সময় আমরা পার করে ফেলেছি। তবে, অপুষ্টিসহ অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে বিশ্ব এখনও অনেক পিছিয়ে। কোভিড-১৯ মহামারির আগের অগ্রগতির হিসেবে শুধুমাত্র ক্ষুধা নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হতে আরও ৮৬ বছর অর্থাৎ ২১১৬ সাল পর্যন্ত লেগে যাবে।

এই পরিস্থিতিতে এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে তা নির্দিষ্টকরণের জন্য বিগত বছরগুলোতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করেছেন। 

যৌথ পর্যালোচনা ও গবেষণায় দেখা গেছে, অপুষ্টি মোকাবিলার সবচেয়ে স্মার্ট পদ্ধতির একটি হলো-গর্ভবতী নারীদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া। অল্প খরচে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করা গেলে তাদের গর্ভের শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা যাবে।

অনেক দেশের সরকার ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুসরণ করে মায়েদের রক্তশূন্যতা এবং নবজাতকের নিউরাল টিউব ত্রুটি প্রতিরোধে গর্ভবতী নারীদের আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের পরিপূরক প্রদান করছে। এই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী নারীদের জন্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অন্তর্ভুক্ত ট্যাবলেট উৎপন্ন করা যেতে পারে, এবং সেগুলো বিতরণের জন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের ছোটখাটো কিছু প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এজন্য সরকারগুলোর খুব বেশি অর্থ খরচ করতে হবে না।

নতুন এই ট্যাবলেটগুলো ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে তৈরি করা হচ্ছে। এতে আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড ছাড়াও ১৩টি ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ভিটামিন এ, বি১, বি২, বি৬, বি১২, ডি, ই প্লাস জিঙ্ক, কপার, আয়োডিন এবং সেলেনিয়াম। এই খরচ এতোটাই কম যে, একজন মায়ের জন্য ১৮০ দিনের এই ট্যাবলেটর ব্যয় মাত্র এক ডলারের সামান্য বেশি। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার পাশাপাশি ৩ কোটি ৬০ লাখ নারীর এক বছরের এই ট্যাবলেটের জন্য খরচ ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মাল্টি-মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সম্পূরকের মাধ্যমে বর্তমানে বার্ষিক ৭ লাখ গর্ভপাতজনিত শিশুমৃত্যুর ৭% রোধ করা সম্ভব, একইসঙ্গে কম ওজনের শিশুর জন্ম ২১% এবং শিশুর অকাল মৃত্যু ৫% কমাবে।  কম ওজন এবং অকাল প্রসব এড়ানো মানে শিশুদের অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমানো। এর ফলে প্রতিবছর  এক কোটি ৬০ লাখ শিশুর খর্বাকৃতির সমস্যা এড়ানো যাবে এবং প্রাপ্তবয়সে তারা আরও বেশি উৎপাদনশীল হবে।  হিসাব বলছে, তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করবে।  অর্থাৎ, এই খাতের পেছনে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩৮ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে।

ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থেকে আলাদাভাবে বিতরণ করা হয়, এই ট্যাবলেটগুলো আকারে একটু বড় এবং গর্ভাবস্থার শেষ ২০ সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি ট্যাবলেট  প্রয়োজন হয়। ৩ কোটি ৬০ লাখ গর্ভবতী নারীর আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিডে ঘাটতি মেটাতে খরচ হবে ২১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শিশুদের কম ওজন ও অকাল প্রসব রোধের পাশাপাশি প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও এক্লাম্পসিয়া কমাতে ক্যালসিয়াম গুরত্বপূর্ণ। এক্লাম্পসিয়া একধরনের গুরুতর অবস্থা যেখানে উচ্চ রক্তচাপের ফলে গর্ভাবস্থায় বা শিশু জন্মের সময়  নারীর খিঁচুনি হয়। ক্যালসিয়ামের সরবারহ নিশ্চিত করা গেলে বছরে  ৮,৫০০  মাতৃমৃত্যু রোধ করা সম্ভব। এ খাতে চার বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের বিপরীতে ১৯ গুণ সামাজিক সুবিধা আসবে।

গর্ভবতী নারীদের জন্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সম্পূরক নিশ্চিত করা একটি চমত্কার নীতি, কিন্তু এটিই সব নয়। অর্থনীতিবিদরা আরও বেশ কিছু অত্যন্ত কার্যকর নীতি চিহ্নিত করেছেন। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতের জন্য বিনিয়োগ ব্যয়বহুল, তবে সেটি করা গেলে এর বিপরীতে ১৬ গুণ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্বভ।  এছাড়া,  কৃষির ফলন বাড়াতে বিনিয়োগ বাড়াতে জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে কম খরচে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, যা  অপুষ্টি হ্রাস করবে। এই খাতের পেছনে ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৩৮ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে।

গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি সহায়তায় আরও বেশি বিনিয়োগ এসডিজির অগ্রগতি অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে একটি। এই ধরনের স্মার্ট পলিসিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ করার জন্য আমরা বিশ্বের কাছে ঋণী।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

- বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজন দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব

-  এসডিজি বাস্তবায়নে যে ভুলগুলো করেছে বিশ্ব

শিশু ও মাতৃমৃত্যু কমলে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে

-টিকাদানে আগ্রহী হওয়া উচিত যেসব কারণে

-দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ডিজিটাল সমাধান

-যক্ষ্মা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ বাকি


About

Popular Links