Friday, June 14, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ?!

জীবনে লেখাপড়াটা হয়েছে, কিন্তু বোঝাপড়াতে দারুণ ঘাটতি থেকে গেছে

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০১:৫৪ পিএম

আমরা ছোটবেলা থেকে অনেক কথায় শিখেছি, তোতাপাখির বুলি’র মতো এবং আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই সেগুলো সারাজীবন আউড়ে চলি। সেগুলো আদৌ ঠিক কি-না, সমকালে প্রাসঙ্গিক কি-না। সবচেয়ে বড় কথা হলো- ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সেগুলোর বাস্তবিক চর্চা কিংবা প্রয়োগ আছে কি-না সেসব বিষয়ে আমাদের মাথাব্যাথা নেই। 

এমন অসংখ্য উদহারণ দেওয়া যায়। এই লেখা শিশুদের সম্পর্কে দু-একটি প্রচলিত বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই।

আমরা স্কুল জীবনে ভাব সম্প্রাসরণ পড়েছি, “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। পড়েছি, মুখস্থ করেছি এবং পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দিয়েছি। আমরা এমনই অভাগা, ভাব সম্প্রসারণ যে ভাবের সম্প্রসারণ, একটা বক্তব্যের নিগূঢ় অর্থের বিশ্লেষণ সেই কথাটুকুও বোঝানোর মতো শিক্ষক আমাদের অনেকেই স্কুল জীবনে পাইনি। বক্তব্যটি যে জেন্ডার সংবেদনশীল নয়; সেটা তো আমাদের শিক্ষকদের মাথায়ই আসেনি। প্রায় ৯৯% ভাব সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আমরা বক্তব্যের সমর্থনেই যত রকমের আবেগী বাক্য একের পর এক সাজিয়ে খাতা ভরিয়েছি। আসলে আবেগী কথামালা সাজানোর মতো ন্যুনতম কষ্টটুকুও আমাদের করতে হয় নাই, গাইড বই প্রণেতারা আমাদের মা-বাবা’র লক্ষীর ভাণ্ডারের বদৌলতে করে দিয়েছেন, আমাদের শিক্ষকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, কোনটার চেয়ে কোনটা সুখপাঠ্য। আমরা কিনেছি, পড়েছি এবং খাতায় তার প্রতিফলন দেখিয়েছি। এর বাইরে কিছু শিখিনি। শিখলে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র শিশুদের প্রতি ন্যুনতম সংবেদনশীলতা দেখাত।

প্রতীকী ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

পূর্বসূরীরা খুব গর্বের সঙ্গে বলেন, মা-বাবারা নাকি তাদের শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলতেন, “শুধু হাড়গুলো আমাদের, চামড়া এবং মাংস আপনার।” তার ফলেই নাকি তারা আজ এই পর্যায়ে আসতে পেরেছেন। কী ভয়াবহ কথা! শিশুর মনন না বুঝে, শুধুমাত্র মারের ভয় দেখিয়ে, আক্ষরিক অর্থে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে শিশুকে মানুষ করে তোলার নিদারুণ চেষ্টা। 

ফলাফল যা হওয়ার তাইই হয়েছে, জীবনে লেখাপড়াটা হয়েছে, কিন্তু বোঝাপড়াতে দারুণ ঘাটতি থেকে গেছে। তাই তো আজও তারা ছবক দিয়ে বেড়ান, মারের ওপর ওষুধ নাই। শুধু মার আর শাসনের ওপর রেখে আগামী দিনের কথিত ভবিষ্যৎদের মানুষ করে তোলার যে তরিকা, তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলেই জাতি হিসেবেও আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছি। 

এই তো বছর কয়েক আগের কথা- কোনো নারী একাধিক ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে লোকাল বাসে উঠলে, কিংবা বাসের মধ্যে বাচ্চা কান্নাকাটি করলে বাসের হেল্পার-কন্ডাক্টর বলতেন, একটা-দুইটা তো পোষানি দিয়ে এলেই হয়। বাসের অন্য যাত্রীরাও এই কথায় বেশ মজাই পেতেন। অবস্থার যে খুব পরিবর্তন হয়েছে সেটা বলা যাবে না। তবে গোটা বাসের মধ্যে এক-দু’জন হয়ত এখন এরকম বক্তব্যের বিপরীতে বাস শ্রমিকদের ভর্ৎসনা করার মতো লোকের দেখা মিলত, এইটুকুই ফারাক আর কি! আহা আগামীদিনের ভবিষ্যৎদের কী দারুণ সমাদর!

মাসখানেকের মধ্যে আমি একাধিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সভায় উপস্থিত ছিলাম। বিরোধের বিষয় দাম্পত্য কলহ। তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে কিংবা যাবে কিন্তু প্রত্যেক দম্পতির এক বা একাধিক সন্তান রয়েছে। দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে সন্তানের উপস্থিতিতেই উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়েছে। একজন বাবা যিনি কি-না তার ঔরসজাত সন্তান যার বয়স বছর দেড়েক হবে, একবার তাকিয়েও দেখলেন না। মা অবশ্য তার সন্তানের কথা ভেবে পুনরায় সংসারে ইচ্ছুক ছিলেন। অন্যটা এর বিপরীত, বাবা ইচ্ছুক কিন্তু মা ইচ্ছুক নন। এখন কথা হলো, এই যে মা কিংবা বাবার একত্রে বসবাসের অনিচ্ছার ক্ষেত্রে একাধিক যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সন্তানের কথা তো কোনো এক পক্ষ কিংবা উভয়পক্ষই মাথায় রাখছেন না। আমি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানি না। তবে শুনেছি এবং বলা যায় বিশ্বাসও করি, সন্তানের এক হাজার দিন বয়স পর্যন্ত মা-বাবার সন্তানের সংস্পর্শে থাকাটা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য জরুরি। অথচ এই বয়সের আগেই অনেক শিশুকে মা কিংবা বাবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতে হচ্ছে।

প্রতীকী ছবি/আইস্টক

সমাজ এবং রাষ্ট্র যদি  শিশুদের  প্রতি ন্যুনতম সংবেদনশীল হতো, তাহলে সন্তান জন্মদানের আগে মা-বাবাদের মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, প্রি-প্যারেন্টিং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করত। 

আমি জানি আমাদের দেশের আর্থ –সামাজিক বাস্তবতায় এইসব কথাকে আপনারা উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা হিসাবে অভিহিত করবেন। কেউ কেউ হয়ত পাশ্চাত্যের ভাবনা, ধার করা কথা বলে টিপ্পনী কাটবেন। কিন্তু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার দোহাই দিয়ে তো আমরা এমন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না। রাষ্ট্রের ভেতর কাঠামোকে দুর্বল রেখে উপরি কাঠামোর উন্নয়ন যতই হোক না কেন, সেই উন্নয়ন কখনো টেকসই হবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে মা-বাবা উভয়ের কাছ থেকেই শিশুদের আলাদা হয়ে যেতে হচ্ছে। হাসপাতালের বিছনায়, নির্জন জায়গায় মা-বাবারা কিংবা তাদের আত্মীয় স্বজনেরা শিশুকে ফেলে যাচ্ছেন। আমরা জাতি হিসেবে কতটা অসংবেদনশীল যে মা-বাবা কিংবা স্বজনরা যে শিশুটিকে রেখে কিংবা ফেলে পালিয়ে যান, সেই  শিশুটিকে আমাদের কথিত গণমাধ্যম কিছু কুছু ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত শিশু হিসেবে উল্লেখ করেন। আহা আগামীদিনের ভবিষ্যতের কী নিদারুণ বিশেষণ! ফেলে কিংবা রেখে যাওয়া এই শিশুরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কীভাবে হবে, যেখানে তাদের নিজেদের বর্তমানই অনিশ্চিত?

যে কারণে ভাব সম্প্রসারণের কথা উল্লেখ করলাম, এই যে শিশুরা মা-বাবার সংস্পর্শ, আদর-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে বড় হচ্ছে, হবে এদের ব্যাপারে সমাজ বা রাষ্ট্রের সেই অর্থে কোনো উদ্বিগ্নতা দেখি না। কিন্তু মুখে সেই ছোটবেলার শেখা বুলি আজও আমাদের সমাজপতিরা, আইনপ্রণেতারা আওড়ে যাচ্ছেন। 

কয়েকদিন আগে ঢাকা শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হাসপাতালের শিশুবিকাশ কেন্দ্রের সামনে শত শত মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে অপেক্ষা করছেন ডাক্তার দেখানোর জন্য। এই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তাদের বসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। মা-বাবার সঙ্গে শিশুরাও দরদর করে ঘামছে। আহা! এই হলো আগামীদিনের ভবিষ্যৎদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের নমুনা।

ফাইল ছবি/ঢাকা ট্রিবিউন

শিশুর মানসিক বিকাশ যথাযথভাবে হচ্ছে কি-না কিংবা বিকাশের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতার কোনো ব্যত্যয় আছে কি-না, সেগুলো মা-বাবাকে নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মূলতঃ এই শিশু বিকাশ কেন্দ্রের যাত্রা। যতদূর জানি, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ব্যতীত দেশের মাত্র  সাতটি মেডিকেল কলেজে এই শিশু বিকাশ কেন্দ্র আছে। তাহলে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষেরা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মা-বাবারা কোথায় যাবেন শিশুদের নিয়ে? তারা কি আদৌ জানেন, যে শিশুর মধ্যে স্বাভাবিকতার ভিন্নতা লক্ষ্য করলে এমন কোনো জায়গাতে যেতে হয়, কোন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হয়?

আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র যে শিশুদের প্রতি সংবেদনশীলতার পরিবর্তে মানসিক পীড়ন চালায়, এ কথা বললেও বোধহয় অত্যুক্তি হবে না। শিশুর কাছে পরিবারের প্রত্যাশা, সমাজে কার চেয়ে কোন শিশুটি ভাল, মেধাবী এই তুলনা এবং শিশুর সম্মুখে সেগুলোর প্রকাশ যে পীড়ন, তা আমাদের পরিবার এবং সমাজ অনুধাবনই করতে শেখেনি। 

রাষ্ট্রীয় পীড়নের সবচেয়ে বড় উদহারণ হলো বছর বছর পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং মূল্যায়নের ধরন পরিবর্তন। যে দেশে শিশুদের নিয়ে শিক্ষক এবং অভিভাবক বিপরীত অবস্থানে থাকেন, সে দেশে শিশুদের কল্যাণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমি ঢাকার একটি ব্যতিক্রমী স্কুলের কথা উল্লেখ করতে চাই, যে স্কুলে কি-না শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ভর্তি করাতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, সেই স্কুলের একজন অভিভাবক তার সন্তানের মানসিক বিকাশ মূল্যায়ন করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শে দুজন শিক্ষকের মতামত চেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন শিক্ষক যে মন্তব্য করেছেন, তাতে  অভিভাবক নিজেই মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছেন, তাহলে তার সন্তান সেই শিক্ষকের নিকট থেকে কতটুকু সংবেদনশীল আচরণ পান, তা আমরা অনুমান করতে পারি। অথচ এই শিক্ষকেরাই আমাদের আজও শিখিয়ে চলেছেন, ঘুমিয়ে আছেন শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে, গালভরা বুলি আজকের শিশুরাই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ।

আগামী দিনের ভবিষ্যৎদের মধ্যে যদি আমরা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে না দিতে, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি না করতে পারি, যদি তাদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আত্মসম্মানের বোধ জাগ্রত করতে না পারি। যদি তাদের সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে না তুলতে পারি, তাহলে এসব গালভরা বুলি আওড়ানোও আমাদের ছাড়তে হবে। ভাবতে হবে ভিন্নভাবে, বের করতে হবে নতুন পন্থা, নিতে হবে কার্যকরী ব্যবস্থা যাতে আমাদের আগামীদিনের ভবিষ্যৎ, আমাদের আগামী প্রজন্ম, তাদের কল্যাণ এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সর্বাবস্থায় আমাদের অগ্রাধিকার হিসাবে বিবেচিত হয়।

About

Popular Links