Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ কবে?

শহরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয় এড়ানো যায় না, তেমনি মশাঘটিত মহামারি থেকে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউ রেহাই পাবেন না

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২২, ০৮:০৬ পিএম

ষাটের দশকের কলকাতা শহর নিয়ে অনেকে টিপ্পনী কাটতেন সেই বিখ্যাত কথা ছুঁড়ে। “রাতে মশা, দিনে মাছি, এই নিয়ে কলকাতা আছি।” কিন্তু সে বাস্তবতা এখন আমাদের শহর ঢাকায় দেখা দিয়েছে।

অন্য অনেক নাগরিক সুবিধাহীনতার সঙ্গে এখন জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে মশা। এই ক্ষুদ্র প্রাণীর হাতে এখন আমাদের বিপুলায়তনের নগর সভ্যতা বিপদগ্রস্ত। কোভিডে মৃত্যু কমলে শহরবাসীর সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মশা। মশাবাহিত রোগের মধ্যে মারাত্মক হিসেবে উল্লেখ করা যায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া। নগরবাসী জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অবশ্য সংবাদমাধ্যমে দাবি করছে, পর্যাপ্ত ওষুধ ছেটানো হচ্ছে। কিন্তু নগরবাসী এ দাবির সঙ্গে একমত নয়।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার ঘনত্ব বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। মার্চে মশার ঘনত্ব চারগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।”

ঢাকাবাসী বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মশার ওষুধ ছেটানো হয়। তাও নিয়মিত নয়। মশককর্মীরা যেসব ওষুধ ছেটায় তাতে শুধু ধোঁয়া ছাড়া সেখানে কিছুই নেই। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এছাড়া বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মশার উপদ্রব থাকলেও সেখানে সিটি করপোরেশনের কোনো সক্রিয়তা নেই। বিভিন্ন সময় মশক কর্মীরা ফগার মেশিন কাঁধে নিয়ে ঘুরে দেখে যায়। জনপ্রতিনিধিকে জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এমনকি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের “সবার ঢাকা অ্যাপ” এ অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাননি এমন অভিযোগ করছেন অনেকে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশু ফাইল ছবি/মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

দুটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও তা সঠিকভাবে ছেটানো যাচ্ছে না। লোকবলও কম। উত্তর সিটি করপোরেশনের অভিজাত এলাকার তুলনায় অন্য এলাকাগুলোয় পরিচ্ছন্নতা-ব্যবস্থা অপ্রতুল।

দুটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সব ধরনের কার্যক্রম চলছে। পর্যাপ্ত ওষুধও রয়েছে। তবে দুটি সিটি করপোরেশনেই মশা মারার কাজে প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, মশা নিধনে ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে।

তবে ঢাকা দক্ষিণের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “ওষুধের জন্য আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে সত্য। কিন্তু এর বাইরে ডিএসসিসি সরাসরি ১৫ হাজার লিটার (উড়ন্ত মশার জন্য) ওষুধ কিনেছে। এক মৌসুমের জন্য দরকার হয় চার হাজার লিটারের মতো ওষুধ। মশার লার্ভা মারার জন্য সকালে পর্যাপ্ত ওষুধও ছেটানো হচ্ছে।”

ডিএসসিসির এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, “ভরা মৌসুমে মশা থাকবেই। আমরাও পর্যাপ্ত ওষুধ ছিটিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। তবে নালা-নর্দমায় মশার প্রজনন বেশি হচ্ছে। পরিষ্কার করার পরও আবার গাছের পাতা বা অন্য আবর্জনা জমে যাচ্ছে।”

অন্যদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, করপোরেশনে পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলেও লোকবল কম। এজন্য পাঁচটি অঞ্চলের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন পাঁচজন মেশিনম্যান ওষুধ ছিটাতে পারছেন। এক-একটি ওয়ার্ডে পাঁচজন মেশিনম্যান পাঁচ লিটার করে মোট ২৫ লিটার ওষুধ ছেটান। প্রতিটি ওয়ার্ডের আয়তন সমান না হলেও বরাদ্দ সমান।

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে এলাকা বিশেষে কিছু বৈষম্য রয়েছে। ৩ নম্বর (গুলশান) ও ১ নম্বর (উত্তরা) অঞ্চলের নালা-নর্দমা ও ওপরের আবর্জনা পরিমাণে বেশি এবং নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে মিরপুরে দুটি অঞ্চলের ১৫টি ওয়ার্ডে আবর্জনা পরিষ্কার করা হয় দেরিতে। এসব এলাকায় ময়লার অস্থায়ী ভাগাড়ও কম, যার জন্য ওষুধ ছিটানো হলেও মশা বাড়তেই থাকে।”

রাজধানীর রূপনগর, মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোড, আওরঙ্গজেব রোড, শেখের টেক, আদাবর ও আশপাশের এলাকা, ঢাকার হাজারীবাগ, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, পোস্তগোলা প্রভৃতি এলাকায় মশার উপদ্রব অনেক বেড়ে গেছে এবং এ নিয়ে বাসিন্দারা অতিষ্ঠ।

এ পরিস্থিতিতে মশা নিধনে আগামীকাল ১০ মার্চ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ডিএনসিসি এলাকায় মশার উপস্থিতি কমানো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মেয়র।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছেন, “আপনারা যদি গত বছরের সাথে তুলনা করেন, তাহলেই সামগ্রিক চিত্রটা খুবই পরিস্কার হবে। গত বছরের মার্চ মাসের এ রকম সময়ে আমি বলেছিলাম যে, ১৪ তারিখের পরে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে। সেটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল।”

তিনি বলেন, “সেই তুলনায় এবার জানুয়ারিও পার হয়েছে, ফেব্রুয়ারিও পার হয়েছে। আমরা মার্চের মাঝামাঝি চলে এসেছি। এবার এখন পর্যন্ত আমাদের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মশা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।”

মশা নিয়ন্ত্রণহীনতা যখন জনস্বাস্থ্যে হুমকির বড় কারণ তখন এ ধরনের কথার সত্যতা জনগণের সামনে কী তা স্পষ্ট নয়।

শহরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয় এড়ানো যায় না, তেমনি মশাঘটিত মহামারি থেকে উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত কেউ রেহাই পাবেন না। শহরবাসী এ নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনের শুধু কথা শুনতে চায় না। তারা চায় দৃশ্যমান উদ্যোগ।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x