পায়ে চলা পথের শহর মোটেই নয় রাজধানী ঢাকা। এখানে ফুটপাত ধরে চলতে গেলে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পদে পদে হোঁচট খেতে হয় পথচারীদের। এমনকি হাঁটতে গিয়ে রাস্তা পারাপারে যে ব্যাপার, সেখানেও পরিস্থিতি জটিল আর কঠিন। সড়ক বিভাজকের কোথাও আছে কাঁটাতার, আবার কোথাও দাঁড়িয়ে আছে উঁচু দেয়াল।
অনেকেই বলে থাকেন, নিরাপদে চলতে সুবিধা করে দিতেই তো গড়া হয়েছে ওভারব্রিজ। কিন্তু সেগুলোতে গর্ভবতী, বয়স্ক, পা নেই- এমন মানুষদের চড়া যে মহা মুশকিলের সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছেন হাঁটার সেতুর কারিগররা? তাদের নজর অবশ্য পথচারী-বান্ধব নগর গড়ার দিকে নেই। বড় টাকার বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেই যেন সব মনোযোগ কর্তাব্যক্তিদের। তাই তো সামান্য খরচের জেব্রা ক্রসিং বাদ পড়ে গেছে। সাদাকালো ডোরা মুছে দিয়ে রাজধানী শহর ভরে উঠেছে অসামান্য খরচের ফুটওভারব্রিজে।
এই সেতু থেকে আবার শুরুর ফুটপাতে নেমে আসা যাক। যেখানে বাস করেন ছিন্নমূল মানুষ, বসেন হকাররা, নির্মাণসামগ্রী রাখেন ভবন নির্মাতা, পড়ে থাকে আবর্জনা। এত এত উৎপাতে যোগ দেয় আবার ভাঙাগড়ার খেলা। “বাজেট নাই, বাজেট নাই”- বলে বলে যে শহরে নানা উন্নয়ন ঝুলিয়ে রাখা হয়, সেখানে এক কী দুই বছর পরপর ফুটপাতের উপকরণ ও নকশা বদলের বরাদ্দ যে কোথা থেকে আসে সেটাও কোটি টাকার প্রশ্ন।
ধরা যাক, লাল ইটের দারুণ পায়ে চলা পথ বহমান। কিন্তু আবার প্রকল্প এসে গেল। উঠাও ইট, বানাও গর্ত। ফেলো আবার বালি। এবার বসাও রঙিন রঙিন টাইলস। এভাবে কখনো ঢালাই ফুটপাতে, কখনো ইটে, কখনোবা টাইলসে হাঁটা হয়। কিন্তু ফুটপাত উন্নয়নের জোয়ার লেগে থাকে বলে হাঁটাহাঁটির জায়গাটা আসলে মূল সড়কে গিয়ে ঠেকে। সেখানে চলন্ত যানবাহনের সঙ্গে জানবাজি রেখে পথ চলতে হয় পথচারীদের।
এক গুলিস্তানের কথাই যদি বলা হয়, সেখানে পথচারীদের চেয়ে ফুটপাত বেশি দখল করে আছে পথ-ব্যবসায়ীরা। ফুটপাতের দুই পাশে তক্তপোষ পেতে দোকান করা হচ্ছে। মাঝে সামান্য জায়গায় ঠেলেঠুলে চলতে হয় সবাইকে। ফুটপাতে এমন জনজটলা চোখে পড়ে ফার্মগেট, নিউমার্কেট এলাকায়ও। এসব এলাকায় হকার উচ্ছেদের টেকসই কোনো উপায় বের করতে পারেনি প্রশাসন। সকালে উচ্ছেদ হলে বিকেলে আবার পায়ে চলা পথে পসরা সাজায় বিক্রেতারা। অথচ একটু তালাশেই বের হয়ে আসে যে, গুলিস্তানের মতো এলাকায় বেশিরভাগ বহুতল বিপণিবিতান তৈরি হয়েছে হকারদের পুনর্বাসনের খাতিরে।
ভবনে দোকান বরাদ্দ নিয়ে পুরনো হকার পথ ছেড়ে দিলেও বেশিদিন ফাঁকা থাকে না ফুটপাত। আবার সেখানে নতুন কেউ চলে আসে। ফলে পথচারীদের একক অধিকারে কোনোকালেই আসে না শহরের হাঁটার পথ।
ঢাকা মহানগরের সড়ক বিভাজকেও নানা আয়োজন চলে। কোথাও ইটের গাঁথুনি, কোথাও ব্লক, কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, কোথাও কাঁটাতার- বিভাজক নিয়ে কর্মযজ্ঞের যেন শেষ নেই। সেই ধারার সর্বশেষ সংযোজন ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড। বিভাজক উন্নয়নের নামে সেখানে শুধু উপকরণ নয়, উপড়ানো হয়েছে গাছও। তা দেখে বিক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীরা।
পুরনো গাছের বদলে অবশ্য নতুন করে ফুল গাছ লাগিয়ে বৃক্ষপ্রেমীদের তুষ্ট করার প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গাছ রেখেও যে বিভাজকের চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব, সেটা আবার দেখা গেছে গুলশান-মহাখালী মূল সড়কে। সংস্কারের বদলে এখানেও বিভাজক আমূল পাল্টে ফেলা হলো কেন- এ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আরেক রকম প্রতিবাদ হতেই পারে।
কর্তাদের জন্য আশা-জাগানিয়া ঘটনা হচ্ছে- গাছের পক্ষে বৃক্ষপ্রেমীরা সোচ্চার থাকলেও ফুটপাত আর সড়ক বিভাজক নিয়ে নেই কোনো বাদপ্রতিবাদ। তাই সেখানে নাগরিকের টাকায় গড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পাওয়া নগদ বরাদ্দের যথেচ্ছাচার এখনো ধারাবাহিক। শহর ঢাকায় পথচারীদের নাকাল দশা তাই আপাতত বন্ধ হওয়ার নয়। কোনোদিন কী আদৌ শেষ হবে ফুটপাত আর বিভাজক নিয়ে নিরীক্ষার এই পথ?
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



