হযরত মুহাম্মদ (সা.): একজন সংস্কারক, শান্তির দূত ও মানবতার পথপ্রদর্শক

আজ ১২ রবিউল আউয়াল-যে দিনটি মুসলিম বিশ্বের অনেকেই ঐতিহ্যগতভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের দিন হিসেবে পালন করে থাকেন। যারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস করেন, তারা মনে করেন যে মানবজাতিকে পথ দেখানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন জাতির কাছে প্রেরিত অসংখ্য নবী-রাসুলের ধারায় মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বশেষ নবী। তাই মুমিনদের জন্য তিনি জীবনে প্রকৃত সাফল্যের-‘মুফলিহুন’এর-এক আদর্শ, যা অনুসরণীয়।

কিন্তু আজ মুসলিম বিশ্ব আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক-সব দিক থেকেই গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বে প্রায় ৫৭টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ রয়েছে; অথচ এর মধ্যে খুব কম দেশকেই, যদি আদৌ কাউকে, নৈতিক সমাজ বা সুশাসনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। বিভাজন, সংঘাত ও বিরোধ; কর্তৃত্ববাদী শাসন; সম্পদ ও ক্ষমতার চরম বৈষম্য; অবিচার; মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশা; অকার্যকর প্রতিষ্ঠান; ব্যাপক দুর্নীতি; মানবাধিকারের প্রকাশ্য লঙ্ঘন; ক্ষমতার বেপরোয়া অপব্যবহার; স্বার্থপরতা; এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাব-এসবই ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।

বিশ্বে প্রায় দুই বিলিয়ন মুসলমান-মানবজাতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অথচ মুসলিম জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো অসহায়, ক্ষমতাহীন ও দরিদ্র। এই পরিস্থিতি রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে, আর এ সময় বিশ্বাসীরা অনেক ক্ষেত্রেই এর দিকে চোখ ফিরিয়ে রেখেছেন।

মনে হয়, অনেক মুসলমান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পরিচয়, বাহ্যিকতা ও পোশাক-পরিচ্ছদের প্রতি এতটাই মনোযোগী হয়ে পড়েছেন যে, তারা তাদের ধর্মের বৃহত্তর উদ্দেশ্য ও মূল শিক্ষা থেকে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছেন।

আধুনিক যুগের বহু পণ্ডিত ও চিন্তাবিদও একই ধরনের সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তাদের একটি বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ হলো, "একটি প্রজাতন্ত্র তার জনগণ যতটা ভালো, ততটাই ভালো।”

মুসলিমরা যা ভুলে গেছে

সাহাবিরা যখন জানতে চেয়েছিলেন, নামাজ ও রোজার চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ কোনো আমল আছে কি না, তখন নবীজি মানুষের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন, মানুষকে একত্রিত করা এবং বিরোধ মীমাংসা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। অথচ আজ অগণিত মুসলমান যেন এই অগ্রাধিকার ও মূল উদ্দেশ্যটি ভুলে গেছেন। তারা ভুলে গেছেন যে নবীজির মিশন শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সত্য, ন্যায়বিচার, পুনর্মিলন ও শান্তি প্রতিষ্ঠাই ছিল তার শিক্ষার মূল লক্ষ্য।

মুসলিম বিশ্বের এক বিরাট ব্যর্থতা হলো-অসংখ্য মুসলমান এমন সব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিতর্ক ও বিবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, যেগুলোর তুলনায় প্রকৃত গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক গুণাবলি অবহেলিত হচ্ছে। সততা, নৈতিক দৃঢ়তা, সহমর্মিতা, বিনয়, সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ঐকমত্য গড়ে তোলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ-এসব গুণের চর্চা ক্রমেই উপেক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে তারা নবীজির শিক্ষার অন্তর্নিহিত চেতনা ও উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছেন।

মদিনা সনদ (সাহিফাতুল মদিনা): শান্তি ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মডেল

৬২১ খ্রিস্টাব্দে মদিনার একদল মানুষ গোপনে আকাবায় নবী মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাকে মদিনায় আসার আহ্বান জানান। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও পারস্পরিক বিরোধ মদিনার জীবনকে ক্রমেই অসহনীয় করে তুলেছিল। তারা মুহাম্মদ (সা.) এর প্রজ্ঞা ও বিরোধ মীমাংসায় তার অসাধারণ সক্ষমতার কথা শুনেছিলেন। পরের বছর মদিনার আরও বৃহত্তর সংখ্যক গোত্রনেতা ও অন্যান্য মানুষ আকাবায় এসে নবীজির সঙ্গে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন। মূলত তারা তার নেতৃত্ব গ্রহণ এবং বিরোধের ক্ষেত্রে তাকে চূড়ান্ত বিচারক ও সালিশ হিসেবে মেনে নিতে সম্মত হন। এর কিছুদিন পর মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করেন, যা ইতিহাসে ‘হিজরা’ নামে পরিচিত।

মদিনায় পৌঁছানোর পর ব্যাপক আলোচনা, পুনর্মিলনের প্রচেষ্টা এবং ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নবীজি মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। এটি ছিল একটি লিখিত চুক্তি, যার মাধ্যমে মদিনার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায় কী নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করা হয়। প্রচলিতভাবে কিছু সংস্করণে সনদটিকে ৪৭টি ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে। এতে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য, সম্মিলিত নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং বিরোধ মীমাংসার একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।

নবীজির নেতৃত্বে মদিনার পূর্বে পরস্পরবিরোধী ও যুদ্ধরত বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠী একটি একক রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোত্রীয় গোষ্ঠী তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখে; একই সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ শাসনের জন্য অভিন্ন দায়িত্বগ্রহণ করে।

এই অর্জন ছিল অসাধারণ। মদিনায় উদীয়মান মুসলিম সম্প্রদায় ছিল সংখ্যালঘু এবং তাদের মধ্যে বহু অভিবাসীও ছিলেন। তা সত্ত্বেও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন ঐক্য ও দৃঢ়তা অর্জন করেছিল যে, তারা শক্তিশালী মক্কার কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে তিনটি বড় সামরিক সংঘাত মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই মক্কাও মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।

মদিনা সনদ ও আধুনিক সাংবিধানিকতাবাদ

মদিনা সনদ গভীরভাবে বিভক্ত ও পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত গোত্রগুলোকে অনিয়ন্ত্রিত গোত্রীয় প্রতিশোধের পরিবর্তে পারস্পরিকভাবে সম্মত নিয়মের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে একীভূত করতে সাহায্য করেছিল। চৌদ্দ শতাব্দী আগে, যখন সমাজ প্রধানত গোত্রভিত্তিক ছিল, তখন এই সনদ এমন কয়েকটি নীতি প্রবর্তন করেছিল, যেগুলোকে আমরা আজ আধুনিক সাংবিধানিকতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করি।

এর মধ্যে ছিল-একটি সুসংজ্ঞায়িত রাজনৈতিক সম্প্রদায়; শুধু রক্ত বা গোত্রীয় পরিচয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সদস্যপদ; পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব; ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদ; বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সুরক্ষা; সম্মিলিত নিরাপত্তা; রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পরিচালনার নির্ধারিত নিয়ম; বিরোধ মীমাংসার সম্মত ব্যবস্থা; এবং সীমাহীন গোত্রীয় প্রতিশোধের পরিবর্তে সামষ্টিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।

এই কারণেই বহু মুসলিম ও অমুসলিম পণ্ডিত মদিনা সনদকে একটি অসাধারণ দূরদর্শী রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচনা করেছেন-এমন একটি ব্যবস্থা, যা তৎকালীন প্রচলিত গোত্রীয় সংস্কৃতির অনেক ঊর্ধ্বে উঠে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য একটি কার্যকর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিল।

থমাস কার্লাইল, ভিক্টোরীয় যুগের একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, ১৮৪০ সালে লন্ডনে তার বিখ্যাত বক্তৃতা, “দ্য হিরো অ্যাস প্রফেট”-এ দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একজন মানুষ মাত্র দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত গোত্র ও যাযাবর বেদুইনদের একত্রিত করে একটি শক্তিশালী ও সভ্য জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মুসলিম সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আজিজাহ ইয়াসমিন আল-হিবরি তার প্রবন্ধ “ইসলামিক অ্যান্ড অ্যামেরিকান কনস্টিটিউশনাল ল: বরোয়িং পসিবিলিটিস ওর এ হিস্টোরি অব বরোয়িং?” (ইউনিভার্সিটি অব পেনিসিলভিয়া জার্নাল অব কনস্টিটিউশনাল ল)-এ কুরআন, সুন্নাহ ও মদিনা সনদে বিদ্যমান বিভিন্ন নীতির সঙ্গে আমেরিকান সাংবিধানিক নীতির তুলনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা, ফেডারেল ব্যবস্থা, সম্মিলিত প্রতিরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ইসলামি সাংবিধানিক চিন্তাধারা আমেরিকার সাংবিধানিক বিকাশকে কোনোভাবে প্রভাবিত করেছিল কি না।

খ্যাতিমান ইসলামি ইতিহাসবিদ ডব্লিউ. মন্টগোমারি ওয়াট তার মুহাম্মদ অ্যাট মদিনা গ্রন্থে লিখেছেন যে, মদিনায় মুহাম্মদ (সা.)-এর কর্মকাণ্ড তার অসাধারণ নেতৃত্বের প্রমাণ দেয়—যার মাধ্যমে তিনি একটি অত্যন্ত কঠিন ও আইনশৃঙ্খলাহীন মরু-গোত্রীয় সমাজকে একটি সফল রাজনৈতিক সম্প্রদায় বা নাগরিক জাতিতে পরিণত করেছিলেন।

উদারতা, সৌহার্দ্য, সহযোগিতা ও অন্যদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান

৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর মুসলিম সম্প্রদায় যখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, তখনও নবীজি শক্তির অবস্থানে থেকেও হিজাজ ও আরবের অন্যান্য অঞ্চলের অমুসলিম গোত্রগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগী হন। তিনি তাদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা করেন এবং অসাধারণ প্রজ্ঞা, বিনয় ও উদারতার পরিচয় দেন। আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তিনি পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যা শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল।

উপসংহার

১৯৭৮ সালে আমেরিকান জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ও খ্যাতিমান গবেষক মাইকেল এইচ. হার্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য হানড্রেড: এ র‌্যাংকিং অব দ্য মোস্ট ইনফ্লুয়েরন্সিয়াল পার্সনস ইন হিস্টোরি প্রকাশ করেন। তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে প্রথম স্থানে রাখেন-যিশু খ্রিস্ট, বুদ্ধ ও কনফুসিয়াসেরও ওপরে। তার মাপকাঠি ছিল ঐতিহাসিক প্রভাব, অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির কর্ম ও চিন্তা মানব ইতিহাসের গতিপথকে কতটা পরিবর্তন করেছে।

হার্ট তার এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলেন, “ধর্মীয় ও পার্থিব-উভয় ক্ষেত্রেই মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অসাধারণভাবে সফল।”

কুরআনের শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা-যা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন ছাড়া টেকসই হতে পারে না। নবী মুহাম্মদ (সা.) শুধু ন্যায় ও ন্যায্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বই দেননি; তিনি এমন নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল এমন একটি ‘উভয় পক্ষের জন্য কল্যাণকর’ (উইন-উইন) ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সমাজের সকল সদস্যের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।

 আধুনিক যুগের অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তাবিদ জর্জ বার্নার্ড শ’ ১৯৩৫ সালের এপ্রিল মাসে নবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “মুহাম্মদ (সা.) আজ জীবিত থাকলে, আমাদের সময়ে মানবসভ্যতাকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছে এমন সব সমস্যার সমাধান করতে তিনি সফল হতেন।”