Tuesday, August 25, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিসমিল্লাহ খানের সানাই: যে সুরে নেই কোন হিন্দু মুসলমান, নেই গেরুয়া বিদ্বেষ

সানাইকে তিনি অনুষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের একক পরিবেশনার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম

কোনো যুদ্ধের দামামা নেই। নেই কামানের গর্জন, ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ কিংবা সীমান্তের কাঁটাতার। নেই ধর্মের নামে বিভাজনের স্লোগান। আছে শুধু একটি সানাই। তার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসছে এমন এক সুর, যার সামনে মানুষের যাবতীয় পরিচয় যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে আসে। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের সানাই শুনতে শুনতে কখনও মনে হতে পারে, পৃথিবীর রাষ্ট্রনেতাদের যুদ্ধ ঘোষণার আগে যদি কয়েক মিনিট তার সুর শুনতে হতো, তাহলে হয়তো কোনো কোনো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত। ইতিহাস অবশ্য এত সরল নয়। ক্ষমতার রাজনীতি কোনো রাগের আলাপে গলে যায় না, রাষ্ট্রের স্বার্থও একটি সুর শুনে রাতারাতি বদলে যায় না। তবু সংগীতের এমন একটি শক্তি আছে, যা যুক্তি, বক্তৃতা কিংবা রাজনৈতিক ঘোষণার পথ ধরে মানুষের কাছে পৌঁছায় না-তা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে।

বিসমিল্লাহ খানের সানাই সেই অদৃশ্য পথেরই এক অসামান্য শিল্পী।

১৯১৬ সালের ২১ মার্চ বিহারের ডুমরাঁওয়ে জন্মেছিলেন আমিরউদ্দিন খান। পরে তিনিই ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান নামে অমর হয়ে ওঠেন। সংগীত ছিল তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তার পিতা পৈগম্বর বক্স ছিলেন ডুমরাঁও রাজদরবারের সানাইবাদক। শৈশবেই বারাণসীতে এসে মামা আলি বক্স ‘ভিলায়েতু’-র কাছে তার সানাই শিক্ষার শুরু। আলি বক্স ছিলেন কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাইবাদক। এই গুরু-শিষ্য সম্পর্কই বিসমিল্লাহ খানের জীবনকে এমন এক সাংস্কৃতিক পরিসরে নিয়ে যায়, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে সাধনার পরিচয় বড় হয়ে ওঠে।

বারাণসী তার কাছে শুধু একটি শহর ছিল না। ছিল সাধনাক্ষেত্র। গঙ্গার ঘাট, মন্দিরের প্রাঙ্গণ, ভোরের আলো, নৌকার ধীর গতি এবং দীর্ঘ রেওয়াজ-সবকিছু মিশে গিয়েছিল তার সংগীতের সঙ্গে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন ছিল তার জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। সানাই তার কাছে নিছক একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না; সেটি ছিল প্রার্থনার মতো, ধ্যানের মতো, নিজের অন্তরের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের মতো। এই কারণেই বিসমিল্লাহ খানের সানাই শুনলে মনে হয়, কেউ যেন শব্দ দিয়ে কথা বলছেন না-নিঃশব্দের ভিতর দিয়ে কথা বলছেন।

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে তার সবচেয়ে বড় অবদান এখানেই। সানাইকে তিনি অনুষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের একক পরিবেশনার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার আগে সানাইয়ের সঙ্গে বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা কিংবা রাজদরবারের আনুষ্ঠানিকতার সম্পর্ক ছিল গভীর। কিন্তু বিসমিল্লাহ খান দেখিয়ে দিলেন, এই বাদ্যযন্ত্রের স্বরের ভেতরেও রাগের গভীরতা, আলাপের বিস্তার, তানের সূক্ষ্মতা এবং মানুষের অন্তর্গত আবেগ প্রকাশের অসীম সম্ভাবনা রয়েছে।

১৯৩৭ সালে কলকাতায় সর্বভারতীয় সংগীত সম্মেলনে তার পরিবেশনা তাকে বৃহত্তর সংগীতজগতে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। সেই সময় থেকেই সানাইয়ের পরিচিতিও বদলাতে শুরু করে। যে বাদ্যযন্ত্রকে এত দিন মূলত অনুষ্ঠান-অনুষঙ্গ হিসেবে দেখা হতো, সেটিই উঠে এল শাস্ত্রীয় সংগীতের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে। বিসমিল্লাহ খান শুধু সানাই বাজাননি; তিনি সানাইয়ের ভাষাটিকেই নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন। তার বাজনায় সানাই কখনও কাঁদত, কখনও হাসত, কখনও যেন প্রার্থনা করত। কণ্ঠসংগীতের মতো তার স্বরে আবেগের ওঠানামা তৈরি হতো। তার দীর্ঘ আলাপে ছিল ধ্যানের স্থিরতা, আবার দ্রুত গতির তানে ছিল উচ্ছ্বাস। এই দুইয়ের সমন্বয়ই তার বাদনকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে দিল্লির লালকেল্লায় তার সানাই পরিবেশন ছিল তার শিল্পজীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনতার রাজনৈতিক ঘোষণার পাশে একজন মুসলমান শিল্পীর সানাই হয়ে উঠেছিল নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। পরে ১৯৫০ সালের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসেও তিনি পরিবেশন করেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে তার সানাইয়ের সম্পর্ক ধীরে ধীরে একটি প্রতীকে পরিণত হয়। কিন্তু বিসমিল্লাহ খানের প্রকৃত গুরুত্ব রাষ্ট্রীয় সম্মানের চেয়েও বড়।

তিনি এমন এক ভারতকে ধারণ করতেন, যার সংস্কৃতি একক কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ নয়। মুসলমান পরিবারে জন্মেও তিনি হিন্দু মন্দিরে সানাই বাজিয়েছেন। গঙ্গার প্রতি তার ছিল গভীর টান। কাশী বিশ্বনাথের মন্দিরের পরিবেশ তার সাধনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের একটি পথ; সংগীত ছিল সেই অনুসন্ধানের আরও বিস্তৃত ভাষা। এই জীবনদর্শনকে শুধু ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ বলে শেষ করে দেওয়া যায় না। এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের একটি গভীর ইতিহাস রয়েছে। সুফি দরবারের কাওয়ালি, বৈষ্ণব পদাবলি, ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, বাউল—এই ভূখণ্ডের সংগীত কখনও কঠোর ধর্মীয় সীমানার মধ্যে সম্পূর্ণ বন্দী ছিল না। মানুষের চলাচল, ভাষার বিনিময়, গুরু-শিষ্য পরম্পরা এবং দৈনন্দিন সহাবস্থান এক সংস্কৃতিকে অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়েছে।

বিসমিল্লাহ খান সেই মিশ্র সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতীক।
তার জীবন আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও রাখে-সংস্কৃতির মালিক কে? একটি রাগের কি ধর্ম আছে? একটি সুরের কি জাত আছে? গঙ্গার ঢেউ কি কোনো সম্প্রদায়ের সম্পত্তি? সঙ্গীতের কি পাসপোর্ট লাগে? বিসমিল্লাহ খানের জীবন এসব প্রশ্নের কোনো তাত্ত্বিক উত্তর দেয়নি। তার জীবনই হয়ে উঠেছিল উত্তর। এই কারণেই তার সানাই আজকের সময়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে পরিচয়ের রাজনীতি ক্রমশ মানুষকে ভাগ করছে। ধর্মের নামে ঘৃণা, জাতিগত বিদ্বেষ, ভূখণ্ডের সংঘাত এবং রাষ্ট্রীয় অহংকার মানুষের সম্পর্কের মধ্যে নতুন নতুন দেওয়াল তুলছে। প্রযুক্তি আমাদের দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, অথচ মন অনেক ক্ষেত্রে আরও দূরে সরে গেছে। বিসমিল্লাহ খানের সংগীত সেই দূরত্বের বিপরীতে দাঁড়ায়। তার সুরে কোনো যুদ্ধের দামামা নেই। নেই বিজয়ীর উল্লাস। নেই পরাজিতকে অপমান করার ভাষা। সেখানে আছে আকুলতা, বিষাদ, প্রেম, প্রার্থনা এবং জীবনের প্রতি গভীর মমতা। সেই অর্থে তার সানাই রাজনৈতিক স্লোগান না হয়েও গভীরভাবে রাজনৈতিক। কারণ যে শিল্প মানুষকে অন্য মানুষের দুঃখ অনুভব করতে শেখায়, সে শিল্প শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়।

এখানেই বিসমিল্লাহ খানের শিল্পকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন। যুদ্ধের জন্য প্রথমে একজন ‘অন্য’ মানুষ তৈরি করতে হয়। তাকে নিজের মতো মানুষ হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হয়। তার নাম, ধর্ম, ভাষা, পোশাক, ভূগোল-কোনো একটি পরিচয়কে তার মানবিক পরিচয়ের ওপরে বসিয়ে দিতে হয়। তারপর তাকে শত্রু বলা সহজ হয়। আর শত্রুকে হত্যা করাও তখন নাকি কর্তব্য হয়ে ওঠে।সংগীত সেই নির্মাণকে ভেঙে দিতে পারে।

একজন ভারতীয় শিল্পীর সানাই পাকিস্তানের শ্রোতাকে যেমন স্পর্শ করতে পারে, বাংলাদেশের শ্রোতাও তেমনই তাতে নিজের মাটির গন্ধ খুঁজে পেতে পারে। একজন মুসলমান শিল্পীর সুর হিন্দু শ্রোতার চোখে জল আনতে পারে; একজন হিন্দু শ্রোতার সংগীত একজন মুসলমান শিল্পীর হৃদয়ে একই আবেগ তৈরি করতে পারে। এখানেই শিল্পের সবচেয়ে বড় মানবিক ক্ষমতা। বিসমিল্লাহ খান সেই ক্ষমতাকে জীবনের সাধনায় পরিণত করেছিলেন।

তার সংগীতজীবনের স্বীকৃতিও ছিল অসাধারণ। পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণের পর ২০০১ সালে তিনি লাভ করেন ভারতরত্ন। ভারতের চারটি সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানই অর্জন করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো পদক তার প্রকৃত পরিচয় নয়। তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো, ‘সানাই’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই বিসমিল্লাহ খানের মুখ মনে পড়ে।এমন শিল্পী খুব বেশি জন্মান না। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট বারাণসীতে ৯০ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে একটি যুগের অবসান ঘটেছিল। কিন্তু তার সুর থামেনি। কারণ সত্যিকারের শিল্পীর মৃত্যু হয় শরীরে, শিল্পে নয়।

 তার ২০ তম প্রয়াণদিবসে তাই তাকে শুধু শ্রদ্ধা জানানো যথেষ্ট নয়। তার জীবন থেকে আমাদের কিছু শেখারও আছে। শেখার আছে, ধর্ম মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। শেখার আছে, সংস্কৃতিকে প্রাচীর দিয়ে রক্ষা করা যায় না; তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। শেখার আছে, শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি বিভাজন নয়, সংযোগ। আর শেখার আছে, পৃথিবীকে বদলাতে সব সময় বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না-কখনও একটি সুরই মানুষের ভিতরের অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারে। কল্পনা করা যাক, কোনো এক যুদ্ধের প্রাক্কালে দুই দেশের রাষ্ট্রনেতা মুখোমুখি বসেছেন। টেবিলের ওপর যুদ্ধের নথি। পাশে মানচিত্র। সামনে সেনাবাহিনীর হিসাব। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ যদি বিসমিল্লাহ খানের সানাই বাজিয়ে দেয়? যুদ্ধ হয়তো সঙ্গে সঙ্গে থামবে না। ক্ষমতার হিসাব এত সহজে বদলায় না। কিন্তু কয়েক মিনিটের জন্য যদি দুই নেতা চোখ বন্ধ করেন, যদি তাদের মনে পড়ে যায় তাদের নিজের শৈশব, মায়ের মুখ, নদীর গন্ধ, কোনো হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর কথা, কোনো উৎসবের সকাল-তাহলে হয়তো ‘শত্রু’ শব্দটির জায়গায় ফিরে আসবে একজন মানুষের মুখ।

সেই মুহূর্তটিই সংগীতের বিজয়। বিসমিল্লাহ খানের সানাই তাই আমাদের কাছে কেবল অতীতের একটি মধুর স্মৃতি নয়। এটি এক ধরনের নৈতিক আহ্বান। যে পৃথিবী প্রতিদিন আরও শক্তিশালী অস্ত্র তৈরি করছে, তাকে একই সঙ্গে আরও কোমল হৃদয়ও তৈরি করতে হবে। কারণ সভ্যতার প্রকৃত পরীক্ষা মানুষ কত দূর পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারে, তা নয়; মানুষ কত দূর পর্যন্ত ধ্বংস না করে থাকতে পারে, সেটিই। বিসমিল্লাহ খানের সানাই সেই অসম্ভব কোমলতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তার সুরে কোনো গেরুয়া নেই, কোনো সবুজ নেই, কোনো সীমান্ত নেই। নেই হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন। নেই যুদ্ধের উন্মাদনা। আছে শুধু মানুষের দীর্ঘশ্বাস, মানুষের আনন্দ, মানুষের প্রার্থনা। আর তাই আজও মনে হয়, পৃথিবীর সব যুদ্ধের আগে যদি একবার বিসমিল্লাহ খানের সানাই বাজতো-হয়তো ইতিহাস বদলাত না, কিন্তু কয়েকটি হৃদয় বদলে যেত। আর কখনও কখনও ইতিহাস বদলানোর জন্য একটি হৃদয় বদলে যাওয়াই যথেষ্ট।

 

 

                                                     নুরুল ইসলাম বাবুল, শিক্ষক, লেখক ও গবেষক 
প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x