রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে, যা নিয়ে বাড়ছে রহস্য ও প্রশ্ন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের ময়নাতদন্তের তথ্য জানান ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস। তিনি জানান, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে, তবে চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নিহতদের মুখের কাছে পাওয়া তরল পদার্থও কোনো রাসায়নিক বা এসিড বার্নের কারণে নয় বলে জানান তিনি এটি মরদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফল। মুখমণ্ডল "ঝলসে যাওয়া"র মতো দেখানোর পেছনেও কয়েকদিন মরদেহ পড়ে থাকাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।
অথচ এর আগে রবিবার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ বলেছিলেন, "নিহত আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখে রশি পেঁচিয়ে এমনভাবে টানা হয়েছিল যে তার চোখ বেরিয়ে আসে ও চোয়াল ভেঙে যায়। মরদেহ কতদিন পড়ে থাকলে এমন অবস্থা হতে পারে তা তিনি স্পষ্ট করেননি, যদিও এজাহার অনুযায়ী মরদেহ সর্বোচ্চ ৪৮ থেকে ৫২ ঘণ্টা পড়ে ছিল।
হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবার, দুই অভিযুক্ত, গ্রেপ্তারে নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা, ফরেনসিক চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তা সবাই একই ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসের পরনে থাকা শার্ট ও গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তার শার্ট একই রকম হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস এক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, "ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তার পরনে ছিল ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি, অন্য কোনো কাপড় দেইনি।" অন্যদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি খণ্ডন করে জানান, এটি আড়ংয়ের সাধারণ একটি শার্ট, যা হাজারো মানুষের কাছে থাকতে পারে। আসামিকে যেভাবে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল সেভাবেই ব্রিফিং ও আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়ায় চারজনকে হত্যা করে এবং শুক্রবার জুমার নামাজের সময় স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু এই সময়সীমার সঙ্গে দুই আসামির পরিবারের বক্তব্যে গরমিল পাওয়া গেছে।
সিদ্ধার্থের বাবা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় ছেলে বাসায় খেয়ে প্রতিবেশী সীমান্তের বাসায় রাত কাটাতে যায় বলে তিনি জেনেছিলেন। তবে সীমান্তের বাবা সুবাস চন্দ্র দাস এই দাবি অস্বীকার করে জানান, সিদ্ধার্থ শুধু দেখা করে চলে গিয়েছিল, রাতে থাকেনি তার ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। অন্যদিকে মুগ্ধর মা সোনা রানী জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় একসঙ্গে খাওয়ার পর ছেলে নিজের ঘরে যায়, রাতে কখন বের হয় তা তার জানা নেই।
পুলিশ কমিশনারের দাবি, আঙুলের ছাপ মুছতে আসামিরা বাসার দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখে। তবে নিহত পরিবারের চারজনেরই ফোন বন্ধ পাওয়া গিয়েছিল বলে জানান স্বজন পূজা চক্রবর্তী। পুলিশ দুটি ফোন জব্দ করলেও বাকি দুটি ফোন কোথায়, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। এছাড়া ঘটনার রাতে পুরো বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও রহস্যজনক বলে মনে করছেন স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার বর্মন। সংযোগটি স্বাভাবিক ত্রুটির মতো ছিল না, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে খুলে ফেলা হয়েছিল বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে ডিবি উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কিনা তা তাদের জানা নেই।
পাশের নির্মাণাধীন ভবনের যে ছাদ দিয়ে আসামিরা গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করছে, সেই ভবনের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিমাংশু কুমার মণ্ডল জানান, ঘটনার রাতে ফ্যান চালু থাকায় কোনো শব্দ বা চিৎকার তার কানে আসেনি। তিনি জানান, গেট বন্ধ থাকলেও চারপাশের দেয়াল খুব উঁচু নয়, তাই দেয়াল টপকেই আসামিরা ছাদে যেতে পারে বলে তার ধারণা। অভিযুক্তদের তিনি চেনেন না বলেও জানান।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক হিসাববিজ্ঞান শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান এবং নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নির্মাণাধীন দোতলা বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। অবসরের পর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন তিনি। শনিবার (২৩ আগস্ট) রাতে বাসা থেকে তার, স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং রাতে দখিগঞ্জ শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।



