Wednesday, August 26, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচতে দিন

সংরক্ষণের বদলে একে আমরা বিনোদনের বাজারে পরিণত করছি

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২২ এএম

এক পাশে মেঘালয়ের পাহাড়, অন্য পাশে হিজল-করচের বন; মাঝখানে দিগন্তজোড়া জলরাশি-প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট ও প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত এই জলাভূমি শুধু একটি নৈসর্গিক স্থান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা। মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ, বৃক্ষ-লতা, কৃষি, পানি ও হাওরপারের মানুষের জীবন-জীবিকা -সবকিছু মিলেই টাঙ্গুয়ার হাওরের অস্তিত্ব।

কিন্তু সেই হাওরকে আমরা কী করছি?

সংরক্ষণের বদলে বিনোদনের বাজারে পরিণত করছি। আর তার মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষ।

সম্প্রতি চলন্ত হাউসবোট থেকে পড়ে ১০ বছরের শিশু রুকাইয়া নূর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনের নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র আবারও সামনে এনেছে। চলতি বছরেই নৌকাডুবি, পানিতে ডুবে মৃত্যু, হাউসবোটের যন্ত্রে কাটা পড়া, নৌযানের সংঘর্ষসহ একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। ৫ জুন হাউসবোটের মেশিনে পড়ে আট বছরের শিশু সৌম্যতা সরকার নিঝুমের মর্মান্তিক মৃত্যু, ১০ জুন নৌযানের সংঘর্ষে নৌশ্রমিক আমিন মিয়ার মৃত্যু এবং ৭ আগস্ট হাওরে গোসল করতে নেমে পর্যটক আলী আকবর খানের মৃত্যু -এসব ঘটনাকে আর বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

কারণ সমস্যা কেবল নিরাপত্তায় নয়। সমস্যা পর্যটনের ধারণাতেই।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে একটি সংবেদনশীল জলাভূমি হিসেবে বিবেচনা না করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেটিই আজকের সংকটের মূল। দুই শতাধিক হাউসবোট, শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌযান, উচ্চশব্দে গান-বাজনা, রাতভর জেনারেটর, প্লাস্টিক ও মানববর্জ্য, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল -সবকিছু মিলে হাওরের স্বাভাবিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর তৈরি হয়েছে ক্রমবর্ধমান চাপ।

এ চাপের ফল শুধু চোখে দেখা দূষণ নয়; এর গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছে হাওরের জীববৈচিত্র্যে।
একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৪১ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব ছিল। দুই শতাধিক প্রজাতির বৃক্ষ-লতা ও উদ্ভিদ এই জলাভূমির পরিবেশকে সমৃদ্ধ রাখতো। আজ এসবের বড় অংশ বিলুপ্ত কিংবা বিলুপ্তির পথে। যে হাওর একসময় দেশীয় মাছের প্রজনন ও জলজ জীবনের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল ছিল, সেই হাওরেই এখন জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

এ বাস্তবতায় টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল -আরও কত পর্যটক এখানে আনব? তা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত -যা হারিয়ে যাচ্ছে, তা কীভাবে ফিরিয়ে আনব?
দুঃখজনকভাবে আমরা উল্টো পথে হাঁটছি।

পর্যটনকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখিয়ে হাওরের ওপর আরও চাপ তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু সব জায়গাকে পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উন্নয়ন নয়। কিছু ভূখণ্ড, কিছু বন, কিছু নদী এবং কিছু জলাভূমি মানুষের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নয় -সংরক্ষণের জন্য। টাঙ্গুয়ার হাওর সেই বিরল সম্পদগুলোর একটি।

আমরা তাই টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের দাবি করছি না; পর্যটন বন্ধের দাবি করছি।

কারণ পর্যটন এখানে কেবল মানুষের যাতায়াত বাড়ায় না; এর সঙ্গে আসে বাজার, প্লাস্টিক, শব্দ, জ্বালানি, বর্জ্য, নৌযান, অবকাঠামো এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাপ। এক পর্যায়ে পর্যটন প্রকৃতিকে দেখার সুযোগ না হয়ে প্রকৃতিকে ভোগ করার অর্থনীতিতে পরিণত হয়। এই অর্থনীতি স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ওপরও চাপ তৈরি করে। তীরবর্তী জনপদের জীবনযাত্রা, সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বহিরাগত বাণিজ্যিক সংস্কৃতির আগ্রাসন বাড়তে থাকে।
তীরবর্তী মানুষের কাছে টাঙ্গুয়ার হাওর কোনো ‘ট্যুরিস্ট স্পট’ নয়। এটি তাদের জীবন, ইতিহাস, জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ। তাই এই হাওরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্থানীয় মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে পর্যটননির্ভর উন্নয়ন চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।

ইসিএ ঘোষণার মূল দর্শনও হওয়া উচিত সংরক্ষণ ও প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। এমন একটি সংবেদনশীল জলাভূমিকে ব্যাপক বাণিজ্যিক পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে পরে ‘পরিবেশবান্ধব পর্যটন’ শব্দটি জুড়ে দিলেই তার চরিত্র বদলে যায় না। নাম যাই দেওয়া হোক, যদি কোনো কর্মকাণ্ড হাওরের স্বাভাবিক প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, তাহলে সেই কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রশ্নের মুখে পড়বেই।

গত ২ আগস্ট জেলা প্রশাসন হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় ১৩ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, সেপটিক ট্যাংক, ডাস্টবিন, প্লাস্টিক নিষেধাজ্ঞা, উচ্চশব্দ নিষিদ্ধকরণসহ নানা বিধিনিষেধের ব্যবস্থা সেখানে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো -একটি সংবেদনশীল রামসার জলাভূমিকে বাঁচাতে কি আরও বেশি নিরাপদ হাউসবোট প্রয়োজন, নাকি হাউসবোটের প্রয়োজনই নেই?

আমাদের অবস্থান স্পষ্ট: টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বন্ধ করতে হবে।

এটি কোনো সাময়িক আবেগের দাবি নয়; এটি টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রতিবেশগত চরিত্র রক্ষার দাবি। পর্যটনের সম্ভাবনা দিয়ে টাঙ্গুয়ার ভবিষ্যৎ মাপার আগে আমাদের হিসাব করতে হবে -কত মাছ হারিয়েছি, কত উদ্ভিদ হারিয়েছি, কত পাখি কমেছে, কত জলজ প্রাণীর আবাস নষ্ট হয়েছে এবং হাওরের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল কতটা ভেঙে পড়েছে।

এই হিসাবের উত্তর ভয়াবহ হলে পর্যটন বাড়ানোর প্রশ্নই ওঠে না।

টাঙ্গুয়ার হাওরের এখন পর্যটন নয়, পুনরুদ্ধার দরকার। ১৪১ প্রজাতির মাছের যে বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে, তা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিলুপ্ত ও বিলুপ্তির পথে থাকা বৃক্ষ-লতা ও জলজ উদ্ভিদ পুনরুদ্ধার করতে হবে। মাছের প্রজননক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম পুনর্গঠন করতে হবে। হিজল-করচের বন ফিরিয়ে আনতে হবে। পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে হবে। জলাভূমির পানি, মাটি ও খাদ্যশৃঙ্খলকে দূষণমুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি, হাওরের নিজস্ব প্রতিবেশব্যবস্থাকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে দিতে হবে।

রাষ্ট্রের অর্থ, প্রশাসনের শক্তি ও নীতিনির্ধারণের অগ্রাধিকার এখন পর্যটন অবকাঠামো তৈরিতে নয় -বিলুপ্ত জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার, বিলুপ্তির পথে থাকা প্রজাতি সংরক্ষণ এবং হাওরের প্রাকৃতিক উৎপাদনব্যবস্থা পুনর্গঠনে ব্যয় হওয়া উচিত।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে মানুষ দেখবে -এই যুক্তির চেয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর বেঁচে থাকবে -এই যুক্তি বড়। পর্যটক হারালে পর্যটন ফিরে আসতে পারে; কিন্তু একটি বিলুপ্ত প্রজাতি ফিরে না-ও আসতে পারে। একটি ধ্বংস হওয়া প্রতিবেশব্যবস্থা পুনর্গঠনে শত বছর লেগে যেতে পারে।
তাই এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে -টাঙ্গুয়ার হাওর কি পর্যটনের বাজার হবে, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত একটি জীবন্ত জলাভূমি থাকবে?

আমাদের উত্তর স্পষ্ট হওয়া উচিত: টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটনের জন্য নয়। আগে হাওর বাঁচুক, জীববৈচিত্র্য ফিরুক, প্রকৃতি পুনরুদ্ধার হোক। তারপরও যদি কখনো মানুষের প্রবেশের প্রশ্ন ওঠে, সেটি হবে সংরক্ষণের শর্তে -বাণিজ্যিক পর্যটনের স্বার্থে নয়।

কারণ টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচানো মানে শুধু একটি জলাভূমিকে বাঁচানো নয়; বাঁচানো মানে আমাদের জল, মাছ, পাখি, উদ্ভিদ, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

 

 রাসেল আহমদ, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও জনপ্রতিনিধি
প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x