শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙবে কে?

প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও হত্যার খবর। কয়েক দিন ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আলোচনা; তারপর নতুন কোনো ঘটনার ভিড়ে আগেরটি হারিয়ে যায়। কিন্তু যে শিশুর শৈশব সেদিনই শেষ হয়ে যায়, যে পরিবারের জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ অন্ধকার- তাদের কাছে কোনো ঘটনাই ‘পুরোনো খবর’ নয়। 

১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ৫ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ সেই নির্মম বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও পুলিশ সূত্র অনুযায়ী, বাদাঘাট রহমতপুর গ্রামে আসরের নামাজের পর বাড়ির পাশের রাস্তায় খেলছিল শিশুটি। 
অভিযোগ, বিস্কুট দেওয়ার কথা বলে তাকে একটি খালি ঘরে নিয়ে যায় একই গ্রামের এক কিশোর। সেখানে দরজা বন্ধ করে তাকে ধর্ষণ করা হয়। শিশুটি চিৎকার শুরু করলে অভিযুক্ত পালিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং গুরুতর অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। শিশুটির চাচার ভাষ্য, তার প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং সে বারবার আতঙ্কে আঁতকে উঠছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। 

এটি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার ঘটনা নয়। পাঁচ বছরের একটি শিশু খেলতে গিয়ে যদি এমন সহিংসতার শিকার হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই- শিশুর নিরাপত্তার ন্যূনতম নিশ্চয়তা কোথায়? আর একটি গ্রেপ্তারই কি সেই প্রশ্নের উত্তর? তদন্ত, চিকিৎসা, সাক্ষ্য, বিচার এবং আইনানুগ শাস্তি- পুরো প্রক্রিয়াটিই হতে হবে কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। 

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশুধর্ষণের অভিযোগে ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৪৯% বেশি; দুই বছর আগের তুলনায় বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৮%। প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি শিশুর বিপর্যস্ত জীবন, একটি পরিবারের হাহাকার। সংখ্যাগুলো তাই শুধু অপরাধের হিসাব নয়; এগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থার সামনে রাখা কঠিন প্রশ্ন। 

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা ঘর- কোথাও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। শুধু কন্যাশিশু নয়, ছেলে শিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় সামাজিক, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সামাজিক লজ্জা, ভয় ও প্রভাবশালীদের চাপের কারণে অনেক পরিবার অভিযোগ করতেও সাহস পায় না। ফলে অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনের হাত পৌঁছানোর আগেই ভুক্তভোগীর কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়। 

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি নতুন নয়। প্রায় তিন দশক আগে, ১৯৯৭ সালে হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে মিনতি নামের এক দরিদ্র কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছিল। তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র হিসেবে তার বিকৃত মরদেহ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। বিচার চেয়ে রাজপথে মিছিলে হেঁটেছি, স্লোগান তুলেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থের কাছে বিচার বিক্রি হয়ে গিয়েছিল; মূল আসামির বদলে কতিপয় দরিদ্র মানুষকে জেল খাটার অভিযোগও রয়েছে। 

এরপর মধ্যনগরের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকার রংচী হিজলবাগানে এক আদিবাসী মা ও মেয়ের গণধর্ষণের ঘটনা এবং প্রভাবশালীদের চাপে তাদের দেশত্যাগের স্মৃতিও মনে করিয়ে দেয়- আইন থাকা আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়।

এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে আজকের অপরাধের যোগসূত্রটি এখানেই- বিচারহীনতা অপরাধের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। অপরাধী যখন দেখে প্রভাব, অর্থ, ভয়ভীতি কিংবা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগে শাস্তি এড়ানো সম্ভব, তখন আইনের ভয় কমে যায়। আর ভুক্তভোগী পরিবার হারায় রাষ্ট্রের ওপর আস্থা।

বাংলাদেশে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’সহ প্রয়োজনীয় আইন রয়েছে। বড় সংকট তাই শুধু আইনের অস্তিত্বে নয়, প্রয়োগে। একটি ধর্ষণ মামলার তদন্তে বছরের পর বছর কেন লাগবে? নির্ধারিত সময়ে বিচার নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও মামলা ঝুলে থাকবে কেন? দুর্বল তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের ঘাটতি, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষার অভাব- এসব প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেই দিতে হবে।

তবে রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলেই দায়িত্ব শেষ নয়। পরিবারকে শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। ‘সম্মান রক্ষার’ নামে অপরাধ গোপন করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। আর গণমাধ্যমকে কেবল ঘটনার চাঞ্চল্যকর বিবরণ প্রকাশ করলেই চলবে না; মামলার তদন্ত, বিচার ও পরিণতিও অনুসরণ করতে হবে। 

তাহিরপুরের শিশুটির এখন প্রয়োজন দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা এবং তার পরিচয় ও গোপনীয়তার সুরক্ষা। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একটি মামলার পরিণতি শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও পরীক্ষা। 

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার মান নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তা দিয়ে। শিশু ও নারীর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; এটি অধিকার। 

আর তাই প্রতিটি ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে কয়েক দিন পর ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপরাধীর শাস্তি যদি ব্যতিক্রম হয়, তবে অপরাধ সাহস পাবে; বিচার যদি নিয়ম হয়, তবেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙবে কে?’ নয়। প্রশ্ন হলো- আর কত মিনতি, কত শিশু, কত নারীকে হারানোর পর আমরা বুঝব যে, বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই অনেক ক্ষেত্রে অন্য একটি অপরাধের জন্য দরজা খুলে দেওয়া? 

 

 রাসেল আহমদ, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।