জনপ্রিয় সাহিত্যের কেন যেন কদর হয় না! বাংলা সাহিত্যের প্রয়াত জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টি এর বাইরে নয়। শিল্প, সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে নিবেদিতরা তার দিকে তেমন তাকান না। হুমায়ূন আহমেদের জীবদ্দশায় তা হয়েছে। প্রয়াণের পরেও এ অবস্থা পাল্টেনি।
৭০ দশকের প্রথমভাগে হুমায়ূন আহমেদকে প্রথম আবিস্কার করেন এ শতকের বাংলার অন্যতম মণীষী ও লেখক আহমদ ছফা। ড. আহমদ শরীফ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন হুমায়ূনের প্রথম দিকের সাহিত্যকর্মের। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের প্রথম স্বীকৃতি আসে ‘‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’’ পুরস্কার অর্জনে। যে লেখক শিবিরে তখন সক্রিয় মায়েস্ত্রো আখতারুজ্জামান ইলিয়াস থেকে হাসান আজিজুল হক।
অনেকে মনে করেন, এরপর থেকে তিনি ‘‘বাজারি’’ ও ‘‘সস্তা’’ সাহিত্যের পথে হেঁটেছেন। শুধু হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সমালোচনা হয়নি। ব্যাপকভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন এই সৃষ্টিমান।
আশ্চর্য কারণে সাহিত্যকে খুঁতহীন সমান পাল্লায় মাপা হয় না। সমালোচকদের কাজে-কর্মে-কথায় প্রমাণিত হয় ‘‘জনপ্রিয় সাহিত্য’’ ও ‘‘কালজয়ী সাহিত্য’’ দুটি ভিন্ন বিষয়।
এই বাস্তবতায় ২০০৬ সালে অন্যপ্রকাশ প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজের ১৫ তম বই ‘‘হলুদ হিমু কালো র্যাব’’ উপন্যাস নিয়ে অল্প কিছু কথার অবতারণা।
হিমুর অতীন্দ্রিয় নানা কাণ্ড এ বইয়েও আছে। আছে তার মাজেদা খালা ও খালুকে তুমুল হাস্যরসাত্মক বর্ণনা। উপন্যাসে শহরের পার্ক, যৌনকর্মী, মাদক বিক্রি, নজরদারি, শহরের বিবরণ বিভিন্ন বিষয়ে আলো ফেলেছেন হুমায়ূন আহমেদ।
স্যাটায়ার, ফান তুমুলভাবে বিরাজিত হুমায়ূনের অন্য সৃষ্টির মতো এ বইয়েও। কিন্তু সময় বিবেচনায় এ উপন্যাসের রাজনৈতিক গুরুত্ব এই ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে কম নয়। শিল্প, সাহিত্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ বলে কিছু নেই। প্রতিকূলতাই আসল সৃষ্টিমানের পরীক্ষা। হুমায়ূন আহমেদের এ উপন্যাস যারাই পড়বেন, তারই মনে হবে এ পরীক্ষায় অনবদ্য সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। প্রতিবাদে বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে স্লোগান দেওয়া, মিছিল, মিটিং, বিবৃতি, কলাম লেখা, টক শো’র মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রচারণা- মোটেই গুরুত্বহীন নয়। কিন্তু সর্বজনের কাছে সহজে পৌঁছার মতো সার্থক একটি সৃষ্টি মনে হয় এ উপন্যাসকে।
লেখনী দীর্ঘ না করে বরং উপন্যাসের শেষ দিকে হিমুর সঙ্গে বাংলাদেশের দাপুটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আলাপ উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতর তুলে ধরা যেতে পারে।
“ . . .তোমার মধ্যে আমাদেরকে রিডিকিউল করার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছি। why?
আমি বললাম, আপনারা মানুষের জীবন নিয়ে রিডিকিউল করেন, সেই জন্যেই হয়তো?
শুভ্রের বাবা বললেন (তিনি আপনি আপনি করে বলছেন) আপনি কেন আমাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেন না বলুন তো? আপনার যুক্তিটা শুনি। আপনি কি চান না ভয়ঙ্কর অপরাধীরা শেষ হয়ে যাক? ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করতেই হয়। ধ্বংস না করলে এই সেল সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
আমি বললাম, স্যার, মানুষ ক্যান্সার সেল না। প্রকৃতি মানুষকে অনেক যত্নে তৈরি করে। একটা ভ্রূণ মায়ের পেটে বড় হয়। তার জন্য প্রকৃতি কী বিপুল আয়োজনই না করে! তাকে রক্ত পাঠায়, অক্সিজেন পাঠায়। অতি যত্নে তার শরীরের একেকটা জিনিস তৈরি হয়। দুই মাস বয়সে হাড়, তিন মাস বয়সে চামড়া, পাঁচ মাস বয়সে ফুসফুস। এত যত্নে তৈরি একটা জিনিস বিনা বিচারে
ক্রসফায়ারে মরে যাবে- এটা কি ঠিক?
পিশাচের আবার বিচার কী?
পিশাচেরও বিচার আছে। পিশাচের কথাও আমরা শুনব। সে কেন পিশাচ হয়েছে এটাও দেখব। . . .”
গণতন্ত্রের ঘাটতি, দায়হীনতা, বিচারহীনতার বিরাজমানতায় আমাদের অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক অসঙ্গতি আছে। আমরা ভিন্নমত পিষে ফেলতে অভ্যস্ত। আমরা শাসকের চোখে শোষিতকে দেখি না। শাসিতের চোখে শাসককে দেখি না। আমাদের সন্দেহবাদী মন শুধু শত্রু খোঁজে। এক আড্ডায় এক বন্ধু বলেছিলেন, দেশের সবচেয়ে বড় চাকরিজীবী ব্যক্তিটি হচ্ছেন রাষ্ট্রনায়ক। তাকেও পালন করতে হয় হুকুম। তার সীমাবদ্ধতা আমরা বুঝি না। জীবনানন্দ তো বলেই গেছেন, ‘‘এ জগতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি . . .’’
জনপ্রিয় লেখক হিসেবে নিপুণ কৌশলে সত্য বলে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। আর তা প্রচারিত হয়েছে বিপুল মানুষের ভেতর। সমাজ, রাষ্ট্রের রূপান্তরে যারা কাজ করেন তাদের চোখ পড়ুক এই জাদুকরের সৃষ্টির দিকে। কারণ বৃষ্টি দেখা, জোছনা দেখার মতো সত্য বোঝার জন্য হলেও আমাদের হুমায়ূন আহমেদের কাছে ফিরতে হয়।
লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।